কুমিল্লার বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ায় দিন দিন কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বেড়েই চলছে। হাট-বাজার এবং স্কুল-কলেজ এলাকা ও বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় ছোট ছোট গ্রুপে তাদের আভির্ভাব দেখা যাচ্ছে। ইভটিজিং, মাদক সেবন ও অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছে কিশোর ও যুব সমাজ। ছাত্র জনতার আন্দোলনের পর থেকেই কিশোর গ্যাংয়ের প্রসার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই আন্দোলনের পর থেকে কিছু ছেলে বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েছে এবং পিতা মাতার অবাধ্য হয়ে বিভিন্ন গ্রুপ তৈরী করছে।
তবে তাদের এই উত্থানের পেছনে রাজনৈতিক নেতাদের হাত রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। নিজেদের দল ভারি করার জন্য পরোক্ষ ভাবে কিশোরদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে। সম্প্রতি বুড়িচং উপজেলায় একটি কিশোর গ্যাংয়ের অস্ত্র হাতে মহড়া দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নড়েচড়ে বসেছে।
কিন্ত ইতিমধ্যে দুই উপজেলায় অনেকগুলো কিশোর গ্যাংয়ের গ্রুপ মাথাচারা দিয়ে উঠেছে। এখন যদি তাদেরকে দমন করতে না পারা যায়, তাহলে দুই উপজেলার মানুষের কপালে অনেক দুঃখ নেমে আসবে। অভিভাবকদের দ্রæত সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কিশোর গ্যাং এর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর জনমনে ভয় সঞ্চার হয়েছে। কখন যে কি হয়। বিশেষ করে মাদকের সাথে সম্পৃক্ত থাকায় তাদের সাহস ও দৌরাত্ব অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত কয়েক মাস পূর্বে বুড়িচং পৌরসভার জগতপুর গ্রামে তিন কিশোরের ছুরিকাঘাতে ফাহিমা নামে এক অন্তঃসস্তা নারী নিহত হয়েছে। দুই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে কোন না কোন দূর্ঘটনা ঘটছে।
বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ তানভীর হোসেন বলেন, এটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ। তবে আমি আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি হিসেবে আগামী মিটিংয়ে প্রথম এজেন্টা হিসেবে কিশোর গ্যং নিয়ে আলোচনা করবো। স্থানীয় এমপি সাহেব এর সাথে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। ব্রাহ্মণপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ ফারুক হোসেন বলেন, এখনো ব্রাহ্মণপাড়া এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উত্থানের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আমরা বিভিন্ন এলাকার কিশোরদের তথ্য সংগ্রহ করছি। এ ব্যাপারে আমার লোকজন মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। এদিকে বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া এলাকায় কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছেন কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন।
শনিবার (৬ জুন) বিকেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া তার এক পোস্টকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। এতে প্রশংসায় ভাসছেন এমপি জসিম উদ্দিন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়াতে কিশোর গ্যাং কালচার গড়ে উঠতে দেয়া হবে না। পড়ার টেবিলের যে প্রতিযোগিতা, সেটাই গড়ে তোলে সুন্দর জীবন। আর অস্ত্র হাতে অলি-গলিতে কিশোর গ্রুপ যে পথে হাঁটে, সেটার শেষাংশে শুধুই অন্ধকার। সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টি করা ঐ গ্রুপের ছেলেটি আপনার পরিবারের সদস্য নয় তো ?’ এই পোস্টের মাধ্যমে তিনি কিশোরদের শিক্ষা, নৈতিকতা ও ইতিবাচক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও সন্তানের চলাফেরা ও সামাজিক কর্মকান্ডের প্রতি নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেন। পোস্টটি প্রকাশের পর সাধারণ মানুষ মন্তব্যের মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
অনেকেই কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জনপ্রতিনিধিদের এমন অবস্থানকে সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেন। কেউ কেউ এলাকায় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও শিক্ষামূলক পরিবেশ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের এ ধরনের বার্তা কিশোরদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত নানা ঘটনার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। এ বিষয়ে কয়েকজন অভিভাবক জানান, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও পর্যাপ্ত পারিবারিক তদারকির অভাবে অনেক কিশোর বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। তাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কিশোরদের জন্য শিক্ষা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকান্ডের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হলে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি প্রতিরোধে কার্যকর ফল পাওয়া যাবে।