দৌড়ে রেকর্ড করলো খুদে দৌড়বিদ মারুফ

লেখক: হাবিবা বদরুন্নেছা
প্রকাশ: ১ বছর আগে

Spread the love

ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। আর পরিশ্রম করলে এর সুফল পাওয়া যায়, যার জ্বলন্ত উদাহরণ খুদে দৌড়বিদ মারুফ। টানা তিন বছর ধরে জাতীয় পর্যায়ে এথলেটিকস (দৌড়) ইভেন্টে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে এ বছর ২০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে দেশসেরা দৌড়বিদদের তালিকায় নিজের নাম লিখিয়ে তার কাঙ্গিত স্বপ্ন পূরণ করল। শিদলাই আশরাফ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক রফিক স্যার ২০২৩ সালের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার বাছাই পর্বে মারুফের দৌড়ের সাফল্য দেখে নিয়মিত তার খোঁজখবর নিতেন। একসময় তিনি প্রধান শিক্ষককে জানান দরিদ্র পরিবারের এই কৃতী এতিম ছেলে মারুফের কথা। তাকে গাইড করলে সে হয়তো দৌড়ে অনেক ভালো করতে পারবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। এরপর শুরু হয় তার স্বপ্নযাত্রা। ২০২৩ সালের ৫১তম জাতীয় শীতকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় মধ্যম বালক দলে উপজেলা, জেলা, উপ-অঞ্চল এবং অঞ্চল এসব প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে জাতীয় পর্যায়ে এসে যেন তীরে এসে তরী ডুবল তার। অল্পের জন্য হেরে যায় মারুফ। কিন্তু থেমে যাওয়ার পাত্র নয় এতিম উদীয়মান ছেলে মারুফ। বলাবাহুল্য, মারুফের অদম্য ইচ্ছা জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার অর্জন করা। এ বিজয়ের হাতছানি যেন তার চোখেমুখে ফুটে উঠছিল। মন থেকে আন্তরিকভাবে ইচ্ছা পোষণ করলে যে তা পূরণ করা সম্ভব তা দেখিয়ে দিল মারুফ। ২০২৪ সালে আবারও উপজেলা, জেলা, উপ-অঞ্চল, অঞ্চল এসব প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে জাতীয় পর্যায়ে সেইম কাহিনি! এবারও দেশের চারটি অঞ্চলের শেষ আটের লড়াইয়ে ব্যর্থ হয় সে। এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, বিদ্যালয়ের ফেসবুক পেইজে মারুফের এই সাফল্যের পোস্ট দেখে, বিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন ছাত্র, বেড়াখলা গ্রামের কৃতী সন্তান পারভেজ রাহাত চৌধুরী (বিশিষ্ট ব্যাংকার), আমার সাথে যোগাযোগ করে আমাকে ৫০০০/- (পাঁচ হাজার) টাকা দেন মারুফকে এক জোড়া ভালো মানের স্পোর্টস জুতা কিনে দেওয়ার জন্য। তিনি প্রায়ই আমাদের খোঁজখবর নেন এবং দরিদ্র ছাত্রদের আর্থিক সহযোগিতা এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়নে আর্থিক সহযোগিতা করে থাকেন। পরবর্তী সময়ে কুমিল্লার কোথাও এই ধরনের জুতা না পেয়ে ঢাকায় স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে তাকে এক জোড়া জুতা কিনে দিই। জুতা পাওয়ার পর তার আত্মবিশ্বাস যেন বহু গুণ বেড়ে যায়। খুশিতে আকাশপানে তাকিয়ে পরম করুণাময়ের সাহায্য প্রার্থনা করে। সেদিনই যেন মহান আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করেন। তিনি আরো বলেন, এ বছর ২০২৫ সালে, আমার এবং আমার ক্রীড়া শিক্ষকের মাথায় চিন্তার ভাঁজ! এ বছর মারুফকে খেলতে হবে বড় বালকদের দলে! কিন্তু বড় দলের বালকদের তুলনায় তার উচ্চতা কম! এত লম্বা লম্বা ছেলেদের সাথে সে পারবে তো? আশঙ্কার ঘনঘটা শিক্ষকমহলে। উপজেলা এবং জেলায় ১০০ মিটার, ২০০ মিটার, ৪০০ মিটার এবং রিলে দৌড় এই সবকয়টি ইভেন্টেই প্রথম হয়ে উপ-অঞ্চলে যায় মারুফ। উপ-অঞ্চলে ১০০ মিটার এবং ২০০ মিটারে বিজয়ী হয়ে ৪০০ মিটারের পতিযোগিতায় মাটিতে পড়ে গিয়ে মারাত্মক আহত হয় সে। একপর্যায়ে তার দুই হাঁটুর চামড়া ছিলে যায়! মাত্র চার দিন পর ৩অঞ্চলের প্রতিযোগিতা! এই অবস্থায় সে কিভাবে দৌড়াবে, বুঝতে পারে না। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে? প্রধান শিক্ষক বলেন, আমি অনেকটা হাল ছেড়ে দিয়েছি। ভেবেছি জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার/স্বীকৃতি হয়তো তার ভাগ্যে নেই! কিন্তু তাকে বুঝতে না দিয়ে উৎসাহ দিয়েই চলছি। দেখলাম সে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী। তার পায়ে ব্যথা নিয়েই সে গত ২০ ফেব্রæয়ারি অঞ্চলে অংশগ্রহণ করে এবং ২০০ মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় এবং রিলে দৌড়ে প্রথম স্থান অর্জন করে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার সুযোগ পায়। ২৩ ফেব্রæয়ারি বিকেলে সে তার জীবনের শত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সাফল্যের বিজয় কেতন উড়ায় মারুফ। সত্যি সে সাফল্যের তারকা ছিনিয়ে আনল। স্বপ্ন পূরণের যাত্রায় সফল হলো সে। এখনও তার পায়ে ব্যথা এবং ইনফেকশন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সে একজন সম্ভাবনাময় এথলেট। আমার বিশ্বাস, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং গাইডলাইন পেলে সে একদিন দেশের সুনাম বয়ে আনতে পারবে বলে বিশ্বাস করি। আমি পিতৃহারা, এতিম এবং সম্ভাবনাময় খুদে দৌড়বিদ মারুফের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দেশবাসীর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছি। মারুফ যেন বিশ্বনন্দিত হতে পারে। বিশ্বসেরার মুকুট যেন তার মাথায় শোভা পায় এই কামনা করছি।