‘‘এক ভূয়া কাজীর কান্ড’’ ব্রাহ্মণপাড়ায় ২ শতাধিক বিয়ে পড়িয়েছেন অবৈধ কাজী

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৯ মাস আগে

Spread the love

ব্রাহ্মণপাড়ায় কাজী সেজে ২শতাধিক বিয়ে পড়ানোর অভিযোগ উঠেছে মো: আল আমীন নামে এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। জানা যায়, তিনি কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শিদলাই গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে। তিনি কসবা উপজেলার কাইমপুর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। প্রায় ৮ বছর যাবত ভূয়া কাজী সেজে বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রির কাজ করেছেন। প্রতি বছরে অন্তত ৮০—৮৫টি বিয়ে ও তালাক ‘রেজিস্ট্রি’ করেন তিনি। সে হিসাবে গত ৮ বছরে অসংখ্য বিয়ে ও তালাক ‘রেজিস্ট্রি’ করেছেন এই শিক্ষক। তবে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজীদের তালিকায় মো: আল আমীন নামে কারো নামের সন্ধান পাওয়া যায় নাই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্রাহ্মণপাড়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কাজী বলেন, আল আমীন মূলত কাজী না, তার বাবা ফজলুর রহমান এক কাজীর সহকারী হিসেবে কাজ করেন। প্রতি শুক্রবার একই সময়ে ২ থেকে ৩টি বিয়ে হয়। তাই কাজীরা তাদের কাজের সুবিধার্থে তাদের সহকারী হিসেবে কিছু লোক নিয়োগ দেন। তবে আল—আমিন নিজে যেমন অবৈধ ঠিক তেমনি অবৈধ ও ভুয়া জন্মসনদ এবং এনআইডি যে কারো বিয়ের কাজ সম্পাদন করতে পারেন বলে শুনাতে পাই । কিন্তু বিনিময়ে গুনতে হবে ৪—৫ গুন বেশি অর্থ। এমনও শোনা যায়, বৈধ কাগজপত্র থাকলে অন্যান্য নিবন্ধিত ও লাইসেন্সধারী কাজীদের চেয়ে তিনি অর্ধেক টাকা রাখেন। কসবা ও ব্রাহ্মণপাড়া দুটি উপজেলার বিভিন্ন ওয়ার্ডে রয়েছে আল আমীনের বেশ কয়েকজন সহযোগী। এই সহযোগীরা নিবন্ধিত ও লাইসেন্সধারী কাজীদের কাছে না গিয়ে আল আমীনের কাছে বিয়ের জন্য লোকজন নিয়ে যান, এতে তারাও একটা কমিশন পান। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে— বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন আল আমীন নামে এই ভূয়া কাজী। যার আইনগত বিয়ে পড়ানোর এখতিয়ার নেই। ‎কাজী হিসেবে নিয়োগ পেতে যেসব যোগ্যতা প্রয়োজন তার কোনোটাই নেই। কিছু অসাধু আইনজীবী আল আমীনের মাধ্যমে বিয়ে রেজিস্ট্রি করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অথচ ওই ভুয়া কাজীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে নি স্থানীয় প্রশাসন। স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য—সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না পাওয়ায় ভূয়া কাজীর বিরুদ্ধে যথাযথ আইননানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা যাচ্ছে না। এই ব্যাপারে জানতে চাইলে কসবা উপজেলার কাইমপুর গ্রামের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, আল আমীন স্যার আমাদের এলাকার একটি সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। বেশ কয়েকদিন আগে ৮ম শ্রেণি পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর বাল্যবিবাহ পড়ানো অবস্থায় আমরা তাকে হাতেনাতে ধরি এবং ভিডিও রেকডিং করি। ভিডিও করার সময় সে মাফ চেয়ে বলে এই ধরনের অপরাধ আর কখনো করবে না। পরে তার নিকট হতে একটি বই উদ্ধার করি। যা এখনো আমাদের এলাকার কাজী সাহেব এর নিকট জমা রয়েছে। অভিযুক্ত ভূয়া কাজী আল আমীনের কাছে জানতে চাইলে প্রথমে সে অস্বীকার করে বলেন, এগুলো এখন করি না। পরবর্তীতে কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, শিদলাই এরশাদ মিয়ার সহকারী হিসেবে আমার বাবা ফজলুর রহমান কাজ করেন। আমি মাঝে মাঝে স্কুল বন্ধের দিন শুক্রবার—শনিবার বিয়ে পড়াইতাম। কসবা আটকের পর আর বিয়ে পড়াই না। আমি ১৪৪টি না, ১৩৮টি বিয়ে পড়েয়েছি। তবে এর মধ্যে কিছু অপ্রাপ্ত বয়েসের বিয়ে পড়াই। তবে এখন আর বাল্য বিবাহ পড়াই না। এটা আইনে আছে কি না জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, এটা আইনে নাই। আমার ভুল হয়েছে। আমি আর করবো না। এ বিষয়ে শিদলাই ইউনিয়নের তালিকাভূক্ত কাজীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আল আমীন আমার সহকারী না। তার বাবা আমার সহকারী। তবে আল আমীন কিছু বিয়ে পড়াইছে এটা আমি শুনেছি। তার বাবাকে বলা হয়েছে। সে কথা শুনেনি। আমি তার বাবার সাথে কথা বলে আপনাকে জানাবো। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার হেড কাজী মো: মোবারক হোসেনের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আল আমীন মূলত আমাদের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত কাজীদের তালিকায় নাই। আল আমীনের ব্যাপারে অনেকে আমাকে জানাইছে। যার অধীনে থেকে কাজ গুলো করে আমি ওই কাজীকে সর্তক করেছি। বাল্যবিবাহের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যলবিবাহ তো সরকারি ভাবেই নিষেধ রয়েছে। অনেকেই তো আমার কাছে আসবে বাল্যবিবাহ পড়ানোর জন্য। আমি সরকার বিরোধী কাজ করতে পারি না। আমি অনুরাধ করবো তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। জেলা কাজী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নূরে আলম শরীফ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বাল্যবিবাহ পড়ানো সম্পন্ন নিষেধ রয়েছে। আমরা ও আমাদের সমিতির পক্ষ থেকে সকল কাজীদেরকে বাল্যবিবাহ না করানোর জন্য সর্তক করে দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজীদের তালিকায় যেহেতু আল আমীনের নাম নাই। সে তো আমার সমিতির সদস্য না। আমি প্রশাসনকে বলবো তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। এ বিষয়ে কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ছামিউল ইসলাম বলেন, এধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত করে আল আমীন নামে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও মাহমুদা জাহান বলেন, এমন অভিযোগ আমরা পাই নি। আপনার থেকে শুনলাম। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। অবশ্যই তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে কুমিল্লা জজ কোর্টের একজন আইনজীবী বলেন, বর্তমান সময়ে বিয়ের ক্ষেত্রে প্রতারণার প্রবণতা বেড়েছে। আবার অনেক সময় নিবন্ধনহীন ভুয়া কাজীর মাধ্যমে বিয়ে বা তালাক রেজিস্ট্রি করে অনেকে প্রতারিত হচ্ছে। বিয়ের বৈধতা না থাকায় পরবর্তীতে তারা আইনগত সুবিধা পাচ্ছে না। তাই বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা ও কাজীদের নিবন্ধনের বিষয়টি ডিজিটাল হওয়া সময়ের দাবি। এটা কার্যকর করতে পারলে বিয়েতে প্রতারণার দরজা বন্ধ হবে।

  • ব্রাহ্মণপাড়া