কুমিল্লা-৫, বুড়িচং- বি.পাড়ার গণমানুষের নেতা, যিনি এই আসন থেকে চার বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, ডাকসুর সাবেক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক, বুড়িচং এরশাদ ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা বীরমুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্জ অধ্যাপক মোঃ ইউনুস এম পি ২০২১ সালের এই দিনে সন্ধ্যা ৮.৩০মি.এ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন। মহান আল্লাহ সুবহানা তায়ালা তাকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করুন- আমিন।
তাকে নক্ষত্র বলার অনেক কারণ। সাধারণ একটি কৃষক পরিবার থেকে তিনি চার চার বার জাতীয় সংসদ সদস্য হয়েছেন, এটা কম কিসে? আমাদের পাশের বাড়িতে তার মামার বাড়ি। সেই অর্থে তিনি আমার বাবা ভাষাসৈনিক আবদুর রাজ্জাক মাস্টারকে মামা ডাকতেন এবং অসম্ভব সম্মান করতেন। আর আমরা তাকে নানাভাই ডাকতাম। আমার পরম সৌভাগ্য যে, আমার বিয়েতে বরযাত্রী হয়েছিলেন তিনি। রাত যতটাই হোক কেউ ফোন করলে ফোন ধরতেন। কথা বলতেন। এলাকার মানুষকে এভাবে সম্মান করার কারণেই যেন রাজনৈতিক গগণে তিনি নক্ষত্রের মর্যাদায় অভিষিক্ত।
১৯৭৩ সালে তিনি অতি অল্প বয়সে নমিনেশন পেয়ে পাস করেই প্রমাণ করেন তিনি তারকা। ১৯৮৬ সালে যখন তিনি এমপি হন আমরাও সেই মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তার করস্পর্শে বুড়িচং এরশাদ ডিগ্রী কলেজ হয়, বুড়িচং আনন্দ পাইলট ও ব্রাহ্মণপাড়া ভগবান হাইস্কুল সরকারিকরণ হয়। আমরা ৮/১০টাকা বেতনে পড়ার সুযোগ পাই। কুমিল্লা থেকে মীরপুর পর্যন্ত রাস্তাটি সর্বপ্রথম পাকা হয়।
২০০১ সালে বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অনন্য সংগঠন উষা’র প্রস্তাব গ্রহণ করে তিনি সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু ভাইকে নিজ হাতে সংবর্ধনা দেন। একই মঞ্চে দুই পরস্পবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতার বসার এই যে বিরল দৃষ্টান্ত যা অন্য সংসদীয় এলাকায় দেখা যায় না, যা অধ্যাপক মো. ইউনূসের বড় মন ও মহানুভবতার কারণেই সম্ভব হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানটিতে সভাপতিত্ব করেছিল আমার প্রিয় বন্ধু ব্যারিস্টার কামরুল হাসান আর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেছিলাম আমি। সেই থেকে টানা ২০১৮ সাল অবধি তারা একমঞ্চে বসে সারাদেশের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সত্যি তার চলে যাওয়ার শুণ্যতা অপূরণীয়।
তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা এজন্য যে, তিনি প্রতিটি গ্রামের লোকজনকে চিনতেন এবং নাম ধরে বলতে পারতেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তার ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে তিনি বিএনপি থেকে মনোনয়ন পান। তার মনেনয়নের জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্যারের বাসায় ও বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের অফিসে গিয়েছিলাম। সেজন্য শওকত ভাইয়ের বিরাগভাজন হই। নির্বাচনী প্রচারকালে নিমসারে অধ্যাপক মো. ইউনুস ও তার ছেলে ডা. সুমনের উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাকে গুরুতর আহত করা আমাদেরকে হতভম্ভ করেছে। ‘যে বা যারাই এ নিন্দনীয় কাজটি করেছেন, তাদের বিচার মহান আল্লাহ একদিন করবেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আজ সেই কষ্টটি নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন, এটা আমাদের জন্য লজ্জার। বেদনার এবং বিস্ময়ের।’ ( এই অংশটুকু তার মৃত্যুর দিনে ২৭ মার্চ ২০২১ তারিখে দেয়া পোস্টে লিখেছিলাম)। আসামী গ্রেফতারের জন্য পত্রিকায় রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে প্রশাসনে চাপ সৃষ্টি করেছি বার বার। সম্প্রতি বর্তমান এমপি হাজী জসিম উদ্দিন জসিম ভাই আসামীদের গ্রেফতার করার নির্দেশ দিয়েছেন।
অধ্যাপক মো. চলে গেলেন। তার দুই ছেলে আজ বাংলাদেশ সরকারের যুগ্ম সচিব। এক ছেলে স্কয়ারের ডাক্তার।বড় ছেলে অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার, পিএইচডি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান সিটি ডেমোক্রেটিক পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান। আরেক ছেলে কলেজে অধ্যাপনা করেন। আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর তার ছেলেদের অন্ততঃ মানুষের মত মানুষ করে রেখে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। যে চেষ্টা অন্য নেতাদের ক্ষেত্রে খুব একটা দেখা যায় না। তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন। ব্যক্তি হিসেবে তার কোনো ত্রুটি থাকলে তার অত্যন্ত স্নেহের ছোটভাই হিসেবে সকলের নিকট আমি তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করছি। যদিও তিনি ২০১৮ সালে পাস করলে আমাকে পিএস করার অফার ছিল, আর সাংবাদিকতা ছাড়ার কোনো ইচ্ছাই আমার ছিল না।
কার্ল মাক্সের মৃত্যুর পর ফেডারিক এঙ্গেলসের উক্তিটি আজ খুব করে মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীর এই বিশাল জনরাশির মধ্য থেকে আপনারা জানেন যে একটিমাত্র প্রাণ হারিয়ে গেলো। কিন্তু আপনারা জানেন না, এই মানুষটিই এই মুহূর্তে পৃথিবীর সেরা মানুষ। আমি বলব, কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলেও তিনি ছিলেন আমাদের অঞ্চলের সেরা রাজনীতিবিদ ও সফল পিতা। আমরা eternal life এও তার সাফল্য কামনা করি।আজ জুমার নামাজে আমার কিছু প্রিয় মানুষের জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে বিশেষভাবে দোয়া করেছি। প্রিয় নানাভাইয়ের জন্যও বিশেষভাবে দোয়া করেছি, যেন মহান আল্লাহতায়ালা তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করেন। আমিন।
লেখক : এসাইনমেন্ট এডিটর, দ্য নিউ নেশন