কুমিল্লার সীমান্তবর্তী বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দুটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলছে তীব্র জনবল সংকট। দুই হাসপাতালের অনুমোদিত ৩১৭টি পদের মধ্যে ১০২টি পদই শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬৭টি পদের ৪৯টি এবং ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫০টি পদের ৫৩টি পদ শূন্য। এর সঙ্গে ব্রাহ্মণপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ৯ জন চিকিৎসকও প্রেষণে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা কুমিল্লা সদর হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে দুই উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ সরকারি হাসপাতালে কাক্সিক্ষত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জনবল সংকটে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা, অস্ত্রোপচার, প্রসূতি ও শিশু চিকিৎসাসহ হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সার্জারি বিশেষজ্ঞ না থাকায় মেজর ও মাইনর-কোনো ধরনের অস্ত্রোপচারই করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গাইনি সার্জন ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকটে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হচ্ছে। শিশু বিশেষজ্ঞ না থাকায় জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। পাশাপাশি নাক-কান-গলা ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞও নেই। সহকারী সার্জন ও মেডিকেল অফিসার পদেও রয়েছে ঘাটতি। মিডওয়াইফের সব পদ শূন্য থাকায় স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রেও কাক্সিক্ষত সেবা শতভাগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ না থাকায় নার্সদের দিয়েই আপাতত এ দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। হাসপাতাল দুটিতে চিকিৎসক ছাড়াও নার্স, সিনিয়র স্টাফ নার্স এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর একাধিক পদ শূন্য রয়েছে। ব্রাহ্মণপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ল্যাব টেকনিশিয়ানের একটি পদ ও এক্স-রে বিভাগের রেডিওগ্রাফারের পদও শূন্য। জরুরি রোগীদের জেলা শহরে স্থানান্তরের জন্য অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক না থাকায় সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রæত উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার ক্ষেত্রেও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগীদের। বুড়িচংয়ে ৩ লাখ ৪৯ হাজার মানুষের জন্য ৪৯ পদ শূন্য বুড়িচং উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় রয়েছে ১৭২টি গ্রাম। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, উপজেলার ৭৭ হাজার ৮৪৫টি পরিবারের মোট জনসংখ্যা ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৬৩৩ জন। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অথচ ১৬৭টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৪৯টি পদই শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে গাইনি চিকিৎসক বদলী হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় সিজার নিয়ে অনেক সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া এক্সরে টেকনিশিয়ান না থাকায় রোগীদের অনেক দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ফলে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীর সংকট নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সেবাকার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় তাদের কাক্সিক্ষত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মালেকুল আফতাব ভূইয়া বলেন, “স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকট রয়েছে। এই সংকট নিরসনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। অতি দ্রæতই সংকট নিরসন হয়ে যাবে বলে আশা করছি।” ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ১৫০টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৫৩টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে কর্মরত ৯ জন চিকিৎসকও প্রেষণে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা কুমিল্লা সদর হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে সীমিতসংখ্যক জনবল দিয়ে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা চালু রাখতে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে অনেক রোগীকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা শহরে পাঠাতে হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শেখ হাসিবুর রেজা বলেন, “জনবল সংকট রয়েছে। হাসপাতালে ১৫০টি পদের মধ্যে ৫৩টি পদই শূন্য। সীমিত জনবল নিয়ে সেবাকার্যক্রম পরিচালনা করতে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বিষয়টি লিখিতভাবে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে জানানো হয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই শূন্য পদগুলো পূরণ হবে।” তিনি বলেন, “তবু আমরা সীমিত জনবল নিয়েই সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে সেবাকার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।” স্থানীয় সূত্র জানায়, কুমিল্লা-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা হওয়ায় দুই উপজেলা থেকে জেলা শহরে যাতায়াতেও ভোগান্তি রয়েছে। ফলে অনেক সাধারণ মানুষের পক্ষে কুমিল্লা শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই চিকিৎসার প্রধান আশ্রয়স্থল। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা দুলালপুর ইউনিয়নের নাল্লা গ্রামের বাসিন্দা ফারুক মিয়া (৩৭) বলেন, “যেকোনো অসুখ-বিসুখে এই হাসপাতালেই চিকিৎসা নিতে আসি। আমাদের মতো গরিব মানুষের শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সাধ্য নেই। শিশু বিশেষজ্ঞের কথা জানতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছেন—নাই। এরকম অনেক ডাক্তারই নেই। আমরা চাই, এখানেই ভালো চিকিৎসা এবং প্রায় সব ধরনের ডাক্তার থাকুক।” শিদলাই ইউনিয়নের শিদলাই গ্রামের রোগী সানজিদা আক্তার বলেন, “কিছুদিন আগেও দেখেছি সার্জারি বিশেষজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু আজকে এক প্রয়োজনে এসে জানতে পারলাম তিনি বদলি হয়ে গেছেন। শহরে গিয়ে সময় ও অর্থ ব্যয় করা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য। আমরা চাই, উপজেলায় অন্তত ছোটখাটো অপারেশনগুলো হোক। এতে আমাদের মতো মধ্যবিত্তের ভোগান্তি লাঘব হবে এবং চিকিৎসা ব্যয়ও কমবে।” দুই উপজেলার বিপুল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দ্রæত শূন্য পদ পূরণ, প্রেষণে থাকা চিকিৎসকদের নিজ কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।