“রহস্যজনক একটি নির্জন বাংলো” বুড়িচংয়ে রেল লাইনের উপর কাটা পড়ে তিন কিশোর নিহত

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১ বছর আগে

Spread the love

চট্টগ্রাম-ঢাকা রেল লাইনের পাশে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বাকশীমুল ইউনিয়নের মাধবপুর এলাকায় রহস্যজনক নির্জন একটি বাংলা। পরিত্যক্ত এই বাংলোটি কত ঘটনার নিরব স্বাক্ষী। কিন্ত কখনোই ঘটনাগুলোর প্রকৃত কারণ উদঘাটন হয় না। পরিত্যক্ত এই বাংলো বাড়িটি কেনই বা রয়েছে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাংলো বাড়িটি দ্রæতই ভেঙ্গে ফেলা উচিত। অন্যথায় আরো বহু ঘটনার জন্মদাতা হতে পারে এই বাড়িটি। এমনিতেই অনেক অপরাধির আঁতুর ঘর হিসেবে পরিচিতি রয়েছে। এখানেই প্রতিবছরে ঘটে থাকে রহস্যজনক ঘটনা। প্রতিটি ঘটনার রহস্য এই জনপদের মানুষ না জানলেও তবে পরিত্যক্ত বাংলো এ ঘরটি সাক্ষী থাকেন সবসময়, কারণ এই ঘরে নাকি এক সময় ডাকাতদল ও মাদকসেবীদের নিরাপদ আস্তানা ছিলো। এখনো এই ঘরটি তাদের জন্য নিরাপদ। গত বুধবার ভোরে রেল লাইনে কাটা পড়ে নিহত হওয়া তিন কিশোরকে মাদকাসক্ত টোকাই বলেই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের দায়িত্বের ইতিটানা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত? টোকাই, মাদকাসক্ত,পথ শিশু, স্টেশনের ভাসমান মানুষ প্রত্যেকটি মৃত্যু কিংবা হত্যাকান্ডের প্রকৃত ঘটনা উম্মোচন করা উচিত। তাহলে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু কিংবা হত্যাকান্ডের ঘটনা কমবে এবং সাথে অনেক অপরাধ কমতে থাকবে। স্থানীয় ভাবে জানা যায়, বুধবার ভোরে এই স্থানেই ট্রেনে কাটা পড়ে তিন যুবক নিহত হয়, দুই যুবক মৃত্যুর আগে পানি চেয়েছে কিন্তু পানি এনে দেয়নি কেউ। তবে তাদের ভিডিও করে রেখেছে স্থানীয় কয়েকজন যুবক। মৃত্যুর কারণ কেউ না জানলেও অবশেষে দুজনের পরিচয় পেয়েছে রেলওয়ে পুলিশ। তারা টোকাই ছিলেন একজনের নাম সাইফুল। তার মা-বাবা ভিক্ষুক! থাকেন কুমিল্লা রেলস্টেশনের পাশে একটি পরিত্যক্ত ঘরে। অপরজন তুহিন বাড়ি চট্রগ্রামে থাকেন রেলস্টেশনে, মা-বাবার নাম জানা যায়নি। তৃতীয় জন অজ্ঞাত। স্টেশনে ছিলো তাদের ঘর-বাড়ি, জীবন গেলো রেলপথে। আহারে জীবন! ঘটনাস্থলে গত বৃহস্পতিবার গিয়েছিলাম কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বাকশীমূল ইউনিয়নের মাধবপুর রেললাইনে, এখনো পড়ে আছে তাদের পায়ের জুতা, গেঞ্জি, রেললাইনের পাথরে লেগে থাকা রক্তগুলো শুকিয়ে গেছে। তবুও জানা গেলো না মৃত্যুর কারণ!ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছে তারা টোকাই ছিলেন, বড় হয়েছে পথেঘাটে। তাই তাদের মৃত্যুর কারণ জানার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে প্রশাসনসহ অনেকে। স্থানীয়দের একটাই প্রশ্ন তিনজন ট্রেনে কাটা পড়ে মরার কারণ কি? এই রহস্য কি প্রশাসন উন্মোচন করতে পেরেছে? কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বাকশীমূল ইউনিয়নের মাধবপুর এলাকায় রেললাইনের উপর থেকে উদ্ধার হওয়া নিহত তিন যুবকের মধ্যে একজনের পরিচয় মিলেছে। নিহত সাইফুল ইসলাম তার বাবা মায়ের সাথে কুমিল্লা রেল স্টেশনেই থাকতেন। সাইফুল রংমিস্ত্রির কাজ করলেও সে মাদকাসক্ত হয়ে পরে টোকাই হয়ে যায় বলে জানিয়েছে কুমিল্লা রেল স্টেশনের কয়েকজন। সাইফুলের বাবা মোখলেছুর রহমান ও মা আসমা বেগম দুই জনই কুমিল্লা রেলস্টেশনে একটি অস্থায়ী জায়গায় বসবাস করে। তাদের নির্ধারিত কোন পেশা নেই। কুমিল্লা রেলস্টেশন পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক সোহেল মোল্লা জানান, রাত আনুমানিক সাড়ে তিনটায় সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ওই তিন যুবকের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছি। সাইফুল ছাড়াও লোকোমুখে আমরা অপর একজনের নাম তুহিন বলে জেনেছি। তবে বাকি দুইজনের কোন ঠিকানা পাওয়া যায়নি। মরদেহ গুলো ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। মরদেহ কুমিল্লা রেলস্টেশনে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সাইফুল এর বাবা ও মা তার ছেলেকে দাফনের জন্য সহযোগিতার টাকা তুলছেন। সাইফুলের মা আসমা বেগম জানান, ছেলেটাকে যে দাফন করবো সেই খরচের টাকাও নেই। তার বাবাও বাউন্ডুলে। কোনরকম কাজকর্ম করে আমি সংসার চালাই। ছেলেটা কথা না শুনে রংমিস্ত্রির কাজ ছেড়ে দিয়েছে। গত দুপুরে বাড়ি থেকে বের হয়েছে তারপর শুনি রেললাইনে তার মরদেহ পড়ে আছে। সাইফুলের বাবা মোখলেছুর রহমান বলেন, ময়নাতদন্তের পরে মরদেহ দিলে আমরা দেবিদ্বার নিয়ে ছেলেকে দাফন করবো। এদিকে ঘটনাস্থল কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বাকশিমূল মাধবপুর রেল লাইনের উপরে গিয়ে দেখা গেছে, রেলের ¯িøপার ও লাইনের উপর ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। বেশ কয়েক টুকরা টি শার্ট ও দুই জোড়া জুতা পড়ে আছে সেখানে। ঢাকা চট্টগ্রাম রেল পথের বুড়িচংয়ের মাধবপুর এলাকায় ১৬২ নম্বর পিলারের কাছ থেকে সাইফুল ইসলাম সহ তিন যুবকের মরদেহ গুলো উদ্ধার করা হয়। মাধবপুর গ্রামের বাসিন্দা ইজিবাইক চালক শাহেদ মিয়া বলেন, আমি ভোর ছয়টা পাঁচ মিনিটে রেল লাইনের পাশে হাঁটতে আসি। এ সময়ে এসে দেখি একজনের মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে আর দুইজনের পা বিচ্ছিন্ন। যাদের পা বিচ্ছিন্ন হয়েছে তাদের মধ্যে একজন তখনও জীবিত ছিল সে আমার কাছে পানি চায়। কিন্তু গ্রাম দূরে হওয়ায় সে সময় পানি আনার কোন সুযোগ ছিল না। এর মধ্যেই সে মারা যায়। ধারণা করছি ভোর সাড়ে চারটা একে ছয়টার মধ্যে কোন ট্রেন তাদের উপর দিয়ে গিয়েছে। ফকির বাজার জঙ্গলবাড়ি গাড়ী চালক মেহেদী হাসান বলেন, যে তিনজন ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুবরণ করেছে তারা আশেপাশের গ্রামের কেউ নয়। অনেকেই এসেছেন কিন্তু কেউই তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি। সকাল সাড়ে দশটায় পুলিশ এসে মরদেহ গুলো নিয়ে গিয়েছে। স্থানীয় সংবাদকর্মী আক্কাস আল মাহমুদ হৃদয় বলেন, যেখানে তিনজনের মরদেহ পাওয়া গিয়েছে সেখানে একটি পরিত্যক্ত ডাকবাংলো আছে। এখানে অনেকেই মাদক সেবনের জন্য এসে বলে আমরা বিভিন্ন সময়ে খবর পাই। ধারণা করছি তারা এখানে হয়তো ঘুরতে এসেছিল কিংবা মাদক সেবনের জন্য এসেছিল। এসে রেললাইনে ঘুমিয়ে পড়লে তাদের উপর দিয়ে ট্রেন চলে যায়। বুড়িচং থানার ওসি আজিজুল হক জানান, মাধবপুর এলাকায় রেল লাইনে ৩ যুবকের কাটা মরদেহ দেখতে পেয়ে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দেয়। ধারণা করা হচ্ছে- ট্রেনের নিচে পড়ে নিহত হন। এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে লাকসাম থেকে জিআরপি পুলিশও ঘটনাস্থলে পৌছায়।

  • বুড়িচং