জীবন বাঁচাতে মানুষ বিভিন্ন কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করে। অবহেলা কিংবা অসতর্কতার কারণে অথবা সঠিক নিয়ম নীতি অনুসরণ না করার কারনে- এই কর্মস্থলেই মূল্যবান জীবনটা চলে যায়। এভাবেই চলছে আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি কার্যক্রম। সবাই নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে দিন রাত চলন্ত ট্রেনের মতো ছুটছে অর্থের পেছনে। এই চলার কোন গন্তব্য নেই; নেই কোন স্টেশন। কারো কোন হুশ জ্ঞান নেই। টাকার নেশায় এই জাতিকে মাতাল করে রেখেছে- তাই যে যেমন ইচ্ছে তেমন ভাবেই চলছে। জীবন মৃত্যু নিয়ে খেলাধুলায় মত্ত হচ্ছে। যখন কোন দূর্ঘটনা ঘটে তখনই সর্বমহলের হুশ জ্ঞান ফিরে আসে। বুড়িচং ব্রাহ্মপাড়ায় উপজেলার বুক চিরে তিনটি বড় সড়ক অতিক্রম করে গেছে। এছাড়া ছোট ছোট অনেক ফাঁড়ি সড়ক রয়েছে। এই সড়কগুলোর দু’পাশে বিভিন্ন হোন্ডার গ্যারেজ ও রাস্তার পাশে অবৈধ ভাবে স্থাপিত হয়েছে অসংখ্য হাওয়ার মেশিন। এই মেশিনগুলো স্থাপনে নেই কোন নিয়ম নীতি। যার যখন ইচ্ছে হয়- তখনই যথায় তথায় নিজের ইচ্ছে মতো হাওয়ার মেশিন স্থাপন করে। এগুলোকে তদারকি করার মতো কোন প্রতিষ্ঠাণ কিংবা প্রসাশনের কোন দপ্তর নেই। তাই লাগামহীন ভাবেই যত্রতত্র দক্ষ অদক্ষ যে কেহই রাস্তার পাশে হাওয়ার মেশিন স্থাপন করে সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ট্রাক্টর, হোন্ডার চাকায় হাওয়া দেয়। এই মেশিন গুলো চালানোর জন্য কারিগরি জ্ঞান না থাকায় যে কোন সময় দূর্ঘটনা ঘটে থাকে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটে থাকে। তার দায় কার? স্থানীয় প্রসাশনের না কি যারা নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র এই মেশিনগুলো স্থাপন করে জীবন মৃত্যু নিয়ে খেলা করে-তাদের? তারই ধারাবাহিকতায় গত ২ এপ্রিল কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় গাড়ীতে হাওয়া দেয়ার মেশিন বিস্ফোরণে জামশেদ আলম (৫০) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এসময় আহত হয় আরও দুইজন। বুধবার (২ এপ্রিল) বেলা ১২ টায় কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা সদর এলাকায় পেট্রোল পাম্প সংলগ্ন আগানগর এলাকায় জামশেদ আলমের গ্যারেজে দুর্ঘটনা ঘটে। জামশেদ ওই গ্যারেজের মালিক ছিলেন। নিহত জামশেদ উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের আগানগর গ্রামের রহমত আলীর ছেলে। আহতরা হলেন- খাড়াতাইয়া গাজীপুর গ্রামের আবদুল সোবহনের ছেলে মোঃ মহসিন (৩৮), বুড়িচং নোয়াপাড়া গ্রামের রাব্বান ভূইয়ার ছেলে মোঃ শাহ আলম (৪০)। স্থানীয়রা জানায়, দোকানের মালিক জামশেদ আলম গাড়ীর চাকায় হাওয়া দেওয়ার জন্য হাওয়া মেশিনে হাওয়া লোড করছিল। এক সময় হাওয়া মেশিনটি বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে দোকানটি উড়ে যায়। এতে দোকানে থাকায় জামশেদ আলম, মহসিন ও শাহ আলম আহত হয়। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে বুড়িচং উপজেলা সরকারি হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক জামশেদ আলমকে মৃত ঘোষণা করেন। বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিজুল হক জানান, হাওয়া মেশিন বিস্ফোরণে একজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত দুই জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এই বিষয়ে বিশিষ্ট রাজনীতিজ্ঞ এডভোকেট অধ্যাপক মোঃ আবদুল আউয়াল বলেন, যানবাহন চলাচলের কার্যক্রমকে সচল রাখতে- এই মেশিনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে, এই গুলোর দিকে প্রশাসনের নেক নজর দেওয়া দরকার এবং এই মেশিনগুলো স্থাপনের নিয়ম নীতি কি ধরনের রয়েছে, তা সঠিক ভাবে পালন করা হয় কি না সে দিকে সচেতন থাকতে হবে। ব্রাহ্মণপাড়ায় উপজেলার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ডাক্তার মোঃ ইউনুস বলেন, এই মেশিনগুলো রাস্তার পাশে স্থাপন না করে সেইভ জায়গায় স্থাপন করা প্রয়োজন। যেন সাধারণ মানুষের কোন ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হতে পারে। মেশিন চালানোর জন্য দক্ষ কারিগর থাকতে হবে। যেন কোন প্রকারের দূর্ঘটনা ঘটতে না পারে। ব্রাহ্মপাড়ায় উপজেলার আলোকিত মানুষ অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠাণের প্রতিষ্ঠাতা মোশারফ হোসেন খান চৌধূরী বলেন, সড়কে যানবাহন চলাচল করতে হলে হাওয়ার মেশিন প্রয়োজন আছে। তবে এগুলো স্থাপন এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন কিংবা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা সব সময় মনিটরিং করতে হবে এবং মালিকরাও সব সময় সচেতন থাকতে হবে, যেন কোন রকম দূর্ঘটনা না ঘটতে পারে। এ বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ট্রেজারার প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, গাড়ির চাকায় হাওয়া দেওয়ার বিষয়ে আমরা দেখি যে বিভিন্ন সড়কের পাশে অনিয়ন্ত্রিতভাবেই যত্রতত্র মানহীন মেশিন স্থাপন করে অদক্ষ শ্রমিকের মাধ্যমে অনেক মালিক এই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। যাদের এই মেশিন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেই এবং বিশেষ করে যে সকল গাড়ি চালকেরা চাকায় হাওয়া দেওয়ার জন্য নিয়ে আসে তারাও তাদের চাকার সম্পর্কে তাদের ধারণা অনেকাংশে কিছুই নাই, যার কারণে প্রচুর গরম থাকা অবস্থায় যখন চাকায় প্রেসার ঠিক আছে কিনা তা পরিমাপ করা কঠিন সেই মুহূর্ত তারা চাকায় হাওয়া দেওয়ার জন্য নিয়ে আসে। অন্যদিকে সঠিক প্রেসার মেশিন ছাড়াই তারা চাকার পিএসআই নির্ধারণ করতে সক্ষম হয় না, যে কারণে কি মাত্রায় হাওয়া প্রয়োজন সেগুলো বুঝতে সক্ষম হন না। আর তখনি সম্ভাবনা থাকে দুর্ঘটনা ঘটার এবং এতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাণনাশেরও হুমকি থেকে থাকে। মেশিন যিনি পরিচালনা করেন তাদেরও পর্যাপ্ত ট্রেনিং নেই, তাই এই মেশিনগুলো যারা পরিচালনা করে তাদেরকে প্রশিক্ষণের আয়ত্তে আনতে হবে। আমরা দেখি কিছু মেশিন আছে আমদানি করা কিছু আছে লোকালি তৈরি করা, সুতরাং এগুলোরও একটা স্ট্যান্ডার্ড থাকা উচিত যা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত, কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় এ বিষয়ে এখনো এ ধরনের বিধিবদ্ধ কোন আইন অথবা এগুলো স্ট্যান্ডার্ড সম্পর্কে সাধারণ মানুষ অথবা যারা এই কাজের সাথে জড়িত তাদের কোন ধারণা নাই, তাই যত্রতত্র মানহীন ধরনের মেশিনের মাধ্যমে কার্যক্রম গুলো হচ্ছে। জরুরী ভিত্তিতেএই মেশিনগুলো পরিচালনার জন্য বিধি তৈরি করে তা প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থাপনা আরো উন্নত করা প্রয়োজন । বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাহিদা আক্তার বলেন, গাড়ির হাওয়া দেওয়ার মেশিন নিরাপদ করার বা নিরাপদভাবে গাড়িতে হাওয়া দেয়ার জন্য বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করবো।