চা-বাগানে সাংবাদিকদের ব্যতিক্রমী দিন, আনন্দ ভাগাভাগি

লেখক: আতাউর রহমান
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

Spread the love

শুক্রবার ১২ ডিসেম্বর। অগ্রহায়ণের শেষ সময়। আর কদিন পর থেকেই শীতকাল শুরু। সকাল সকাল কুমিল্লা শহর থেকে সাদা রঙের একটি হাইএক্স গাড়িতে আমরা তিনজন (দৈনিক কুমিল্লার জমিন পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক শাহাজাদা এমরান, দৈনিক ব্রাহ্মণপাড়া-বুড়িচং সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক ও ব্রাহ্মণপাড়া প্রেসক্লাব সভাপতি সৈয়দ আহাম্মদ লাভলু ভাই এবং আমি) হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চা-বাগান ঘুরতে রওনা হলাম। আমাদের সঙ্গে এই ভ্রমণে ব্রাহ্মণপাড়া থেকে যুক্ত হবেন আমাদের আরও কয়েকজন সাংবাদিক ভাই। কুমিল্লা-মিরপুর সড়কে সংস্কার কাজ চলায় আমাদের ঘুরপথে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট হয়ে ব্রাহ্মণপাড়ায় পৌঁছাতে হলো। সেখানে বাকি সহযাত্রীরা (প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহাম্মদ, যুগ্ম সম্পাদক হারুনুর রশীদ, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, প্রযুক্তি সম্পাদক ইমাম হোসেন ও সদস্য সোহেল ইসলাম) অপেক্ষায় ছিলেন। দেরি হওয়ায় তারা কিছুটা বিরক্ত হলেও আমরা সকাল সোয়া ৯টার দিকে চুনারুঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভয়াবহ যানজট পেরোতে বেশ সময় লেগে যায়। এ সময় সড়কের পাশের এক মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করি। পথের ক্লান্তি পেছনে ফেলে দুপুরের দিকে পৌঁছাই চুনারুঘাটের সাতছড়া জাতীয় উদ্যানের প্রধান ফটকের সামনে। এ সময় একদল বানরের পালের সঙ্গে আমাদের মজার সময় কাটে। আমরা ফটোসেশন করি। বানরদের ছবি তুলি ও ভিডিও করি। বেশ আনন্দঘন ছিল সেই মুহূর্তগুলো। আমরা একে অপরের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করি। চুনারুঘাটে আমাদের ভ্রমণে সহযোগিতা করেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর অফিসার সুজন পাল ও তার সহযোগীরা। তাদের সাথে ‘নিসর্গ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা বের হলাম চা-বাগানের পথে। হবিগঞ্জ জেলায় মোট ৪০টি চা-বাগান, এরমধ্যে শুধু চুনারুঘাটেই ১৩টি। আমরা কয়েকটি বাগান ঘুরে দেখার সুযোগ পাই। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় দিই চাঁদপুর চা-বাগানে। বিশাল আকারের চা-বাগান। চা-বাগানে ঢুকতেই চোখে পড়ে সবুজের এক অবারিত সমুদ্র। দু’পাশ জুড়ে সারি সারি চা-গাছ, আর কোথাও কোথাও চা-গাছ থেকে কঁচি পাতা তোলা শ্রমিকদের গুনগুন শব্দ। আমরা কাছ থেকে দেখি শ্রমিকেরা কীভাবে বাগান থেকে চা তৈরির উপযোগী কঁচি চা-পাতা তুলে নিচ্ছেন। তাদের দ্রæত হাত চলাচল যেন এক অনুশীলন ছন্দে পাতা তুলছেন। পাতাগুলো ঝুড়িতে ফেলছেন, আবার সামনে এগোচ্ছেন। এ যেন এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। চা-বাগানে অনেকটা সময় পার করার পর আমরা যাই চা-পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণের আধুনিক কারখানায়। সেখানে গাইড আমাদের পুরো প্রক্রিয়াটি দেখান। প্রথমে সংগ্রহ করা তাজা পাতাগুলো উইদারিং ট্রফে এনে হালকা শুকানো হয়। পাতার আর্দ্রতা কমতে থাকে ধীরে ধীরে। এরপর আসে রোলিং মেশিন, যেখানে গোলাকার স্টিলের প্লেটে ঘূর্ণনের মাধ্যমে চা-পাতাকে চূর্ণ করা হয়। এরপর অক্সিডেশন রুমে রেখে দেওয়া হয়; এখানেই চায়ের গন্ধ আর রং তৈরি হয়। তারপর ড্রায়ার মেশিনে উচ্চ তাপে শুকানোর মাধ্যমে চা-পাতা চূড়ান্ত রূপ নেয়। সব শেষে গ্রেডিং মেশিনে আকার ও মান অনুযায়ী আলাদা করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া আমাদের ভ্রমণকে আরও অর্থবহ করে তোলে। ভ্রমণ শেষে একইদিন সন্ধ্যার আলো আঁধারে আমরা আবার রওনা দিই কুমিল্লার পথে। রাতের খাবার খাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার নয়নপুর বাজারের খাঁজা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে। খাবারের পর আবার গাড়িতে উঠে বাকি সহযাত্রীদের ব্রাহ্মণপাড়ায় নামিয়ে দিয়ে রাত সাড়ে ১০টার মধ্যে কুমিল্লা শহরে পৌঁছাই। সব মিলিয়ে ৮জন সাংবাদিকের এই একদিনের ভ্রমণ আমাদের মনে গেঁথে থাকবে চা-বাগানের সবুজ নীরবতা, পাহাড়ি বাতাস আর দলবদ্ধ আনন্দের স্মৃতি হয়ে।

  • ব্রাহ্মণপাড়া