কুমিল্লার দুঃখ! গোমতী নদীর ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা

লেখক: মোহাম্মদ মমিনুল হক ভূইয়া (সুমন)
প্রকাশ: ১১ মাস আগে

Spread the love

গোমতী নদী বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। নদীটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কুমিল্লা জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ৯৫ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৬৫ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক গোমতী নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী নং ০৪।

গোমতী নদী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উত্তর-পূর্বপ্রান্তীয় পার্বত্য অঞ্চলের আঠারমুড়া পর্বতজাত ছাইমা এবং লংতরাই পর্বতজাত রাইমা নদীর সংযোগে গোমতী নদীর উদ্ভব হয়েছে। এই নদী প্রায় ত্রিপুরা রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। প্রাচীন রাজধানী অমরপুর, রাঙ্গামাটি ও উদয়পুর এই নদীর তীরে অবস্থিত। গোমতীর উৎপত্তি স্থানের নিকট কতগুলো জলপ্রপাত দেখা যায়। এসকল জলপ্রপাতের স্থানীয় নাম ডুম্বুর বা ডুমুর। কোন কোন ব্যাক্তি বলেন, জলপ্রপাত সমূহের আকৃতি মহাদেবের হস্তস্থিত ডুম্বুরের ন্যায় বলে শিব উপাসকগণ এদেরকে ডুম্বুর নামে আখ্যা দিয়েছেন। বর্তমানে ঐ স্থানটিই ডুমুর নামে পরিচিত। সর্বনিম্নস্থিত জলপ্রপাত দ্বারা একটি বৃহৎ কুণ্ড গঠিত হয়েছে, সেই কুণ্ড মণ্ডলাকার। জলপ্রপাত জাত কুণ্ডগুলি রাণীকুণ্ড, কাছুয়াকুণ্ড, কমলাকুণ্ড ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ নামে পরিচিত।

সে যাই হোক গোমতী নদী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উত্তর-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চলের এসকল জলপ্রপাত বা ডুমুর নামক স্থানে উৎপন্ন হয়ে পার্বত্যভূমির মধ্য দিয়ে সর্পিল পথে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার অতিক্রম করে কুমিল্লা সদর উপজেলার গোলাবাড়ি, টিক্কারচর, কাপ্তান বাজারের কাছ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে প্রবেশের পর এটি অাঁকাবাঁকা প্রবাহপথে কুমিল্লা শহরের উত্তর প্রান্ত এবং ময়নামতীর পূর্ব প্রান্ত অতিক্রম করে বয়ে চলেছে। প্রবাহপথের উত্তর দিকে বুড়িচং উপজেলাকে ডানে রেখে এটি দেবিদ্বার উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কোম্পানীগঞ্জ বাজারে পৌঁছেছে। ময়নামতি থেকে কোম্পানীগঞ্জ বাজার পর্যন্ত নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ কিলোমিটার। কোম্পানীগঞ্জ থেকে পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়ে নদীটি শেষাবধি দাউদকান্দি উপজেলার শাপটা নামক স্থানে এসে মেঘনা নদীতে পতিত হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ এবং দাউদকান্দির মধ্যে নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ কিলোমিটার। বাংলাদেশ ভূখন্ডে গোমতী নদীর মোট দৈর্ঘ্য ১৩৫ কিমি। গোমতীর গুরুত্বপূর্ণ উপনদীসমূহের একটি ডাকাতিয়া এবং এর শাখা বুড়ি নদী।

গোমতী তীব্র স্রোত সম্পন্ন একটি পার্বত্য নদী। কুমিল্লায় এর প্রবাহ মাত্রা ১০০ থেকে ২০,০০০ কিউসেক পর্যন্ত উঠানামা করে। নদীটির বর্ষাকালীন গড় প্রশস্ততা প্রায় ১০০ মিটার। এ সময়ে নদীটি কানায় কানায় পূর্ণ থাকে এবং স্রোতও হয় দ্রুতগতি সম্পন্ন। কিন্তু শীত মৌসুমে এর গতিধারা সংকীর্ণ হয়ে আসে এবং অধিকাংশ স্থানে হেঁটেই নদী পার হওয়া যায়। স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের বছরে নদীর পানির উচ্চতা পার্শ্ববর্তী এলাকার স্তর থেকে ১.৫ মিটারের উপরে বৃদ্ধি পায়। আকস্মিক বন্যা এ নদীর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য এবং এ বন্যা মোটামুটি নিয়মিত বিরতিতে সংঘটিত হয়ে থাকে। এজন্য এ নদী একসময় ‘কুমিল্লা শহরের দুঃখ’ হিসেবে পরিচিত ছিল।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীটির ধ্বংসাত্মক প্রবণতা প্রতিরোধে এবং কুমিল্লা শহর রক্ষায় বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বন্যা প্রতিরোধের জন্য বেড়িবাঁধ এবং নদীর গতিপথ সোজা রাখতে ১৯টি লুপকাট নির্মাণ করা হয়েছে। এসকল ব্যবস্থা গৃহীত হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন সময় বন্যার প্রকোপে কুমিল্লা শহর বিপদাপন্ন হয়ে পড়ায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক গৃহীত আরও কিছুসংখ্যক প্রকল্প বাস্তবায়নের পর, বর্তমানে গোমতী দৃশ্যত নিয়ন্ত্রণাধীন।

একসময় এই নদীতে বড় বড় লঞ্চ চলত। কিন্তু বর্তমানে নদীটিতে বৃহৎ নৌকা চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় নাব্যতা নেই। কুমিল্লা, ময়নামতী, বুড়িচং, কোম্পানীগঞ্জ, মুরাদনগর এবং দাউদকান্দি এ নদীর তীরবর্তী উল্লেখযোগ্য স্থান। দাউদকান্দি পর্যন্ত গোমতী জোয়ারভাটা প্রভাবাধীন, কিন্তু উজান অঞ্চলে জোয়ারভাটার প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না।

আধুনিকতার ছোয়ায় যান্ত্রিক জীবনে আমরা ক’জনইবা দেখতে পাই গোমতী নদীর নিরব কান্না! চারপাশে প্রভাবশালী ভূমিদস্যু ও স্বার্থান্বেষী মহলের অত্যাচার, আমদের সর্বসাধারণের অবহেলা এবং প্রয়োজনীয় ড্রেজিং এর অভাবে নদীটি দিন দিন হারিয়ে ফেলছে তার নাব্যতা ও বয়ে চলার সৌন্দর্য! নাব্যতা হারিয়ে ফেলায় নদীটি এখন পুনরায় কুমিল্লা ও পার্শ্ববর্তী জেলার লক্ষ লক্ষ মানুষের নিকট এক আতংকে পরিণত হয়েছে। গত বছর এই নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গিয়ে প্রলয়ঙ্কারী বন্যা সৃষ্টি হয়েছিলো এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। তাই এবছর বর্ষার পূর্বেই জরুরি ভিত্তিতে নদীর বেড়িবাঁধ সংস্কারের পাশাপাশি ভূমিদস্যুদের উৎপাত বন্ধ করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও ভয়ানক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

লেখক – মোহাম্মদ মমিনুল হক ভূইয়া (সুমন)
প্রধান শিক্ষক
শিদলাই আশরাফ মাধ্যমিক বিদ্যালয়
ব্রাহ্মণপাড়া, কুমিল্লা

তথ্যসূত্রঃ
* রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস
– শ্রী কৈলাসচন্দ্র সিংহ (১৮৫১-১৯১৪)
* উইকিপিডিয়া
* বাংলাপিডিয়া

  • কুমিল্লা