কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার সুযোগ পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করছে কিন্ডারগার্টেন সংগঠনগুলো। কেউ মানববন্ধন, কেউ সমাবেশ, কেউ পত্রিকা ও স্যোশাল মিডিয়ায় আর্টিকেল লিখে। আমি বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের (দিদার-অদুদ) মহাসচিব। করোনাকালে আমার উদ্যোগে দেশের প্রসিদ্ধ ২২টি সংগঠনকে নিয়ে গড়ে ওঠা ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম ‘কিন্ডারগার্টেন ও সমমান স্কুল রক্ষা জাতীয় কমিটি’র প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে আমি বলব, অতীতের রেকর্ড অনুযায়ী, তুলনামুলকভাবে অধিক মেধাবী প্রায় সমানসংখ্যক শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার সংবিধানবিরোধী, আত্মঘাতী ও স্বৈরাচারী অবস্থান থেকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সরে আসতে হবে।
ফ্যাসিস্ট আমলে করোনার সময় দেশের প্রধান প্রধান সবগুলো কিন্ডারগার্টেন সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করে আমরা স্কুলগুলোকে প্রণোদনা প্রদানের জন্য আন্দোলন করেছিলাম। কারণ, ‘স্কুল আমার। দেশের সবকিছু খোলা থাকলেও সরকারি নির্দেশে প্রতিষ্ঠান বন্ধ, সেহেতু বছরের পর রছর ধরে এমন বন্ধ স্কুলের ভাড়া কে দেবে? সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকরা বেতন পেলেও কিন্ডারগার্টেনের আয় বন্ধ থাকায় শিক্ষকরা বেতন পাননি। ফলে প্রায় ১৫ লক্ষ শিক্ষক-কর্মচারী মানবেতর জীবন যাপন করেছে। কেউ পেশা পরিবর্তন করেছে। প্রায় ১০ হাজার স্কুল বন্ধ হয়েছে। কিছু স্কুল বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি হয়েছে! আর কিছু বলব? সবাই পেলেও প্রণোদনা থেকে শুধু কিন্ডারগার্টেনগুলোকে বঞ্চিত করা হয়েছে এই বলে যে, এগুলো নাকি বেশিরভাগই জামায়াত-শিবিরের! আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, এখন তাহলে কী তকমা দিয়ে এই গণবিরোধী সিদ্ধান্ত?
তখন প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনকে প্রণোদনার জন্য বললে তিনি প্রশ্ন করেন, আপনারা রেজিস্ট্রেশন করেন না কেন? আমরা বললাম, ২০ হাজার আবেদন অধিদপ্তরে জমা। সেগুলো হয় অনুমোদন দেন, নইলে রিজেক্ট করেন। তিনি বললেন, আমি তো জানি না। কেমন প্রতিমন্ত্রী বুঝেন? এটা পত্রিকায় নিউজও হয়েছে। প্রশ্ন হলো, প্রতিষ্ঠানগুলোই কি রেজিস্ট্রেশন করছে না, নাকি টেবিলের নিচ দিয়ে লেনদেনের প্রশ্নে আপস না করায় অসাধু কর্মকর্তাদের কারণে নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ভাটা পড়েছিল, এব্যাপারে আমি কিছু বলতে চাই না। সরকার একটুখানি অনুসন্ধান করলেই ভালো হয়। রেজিস্ট্রেশন সহজ করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কোটি কোটি টাকা রেভিনিউ আনার প্রক্রিয়ায় বাধা তাহলে কারা? তাদের খুঁজে বের করতে হবে।
ইএমআইএস নাম্বার ও স্কুল কোডের মাধ্যমে প্রতিবছর স্কুলগুলোর জরিপ হয়। সেখানে স্কুলের ঠিকানা, জেলা/উপজেলা সদর থেকে দূরত্ব, বিস্তারিত বিবরণ যেমন : কতটুকু জায়গায় স্কুল, কয়টি রুম, বিল্ডিং কতসালে নির্মিত হয়েছিল, কতজন শিক্ষার্থী, কতজন ছেলে, কতজন মেয়ে, কোন ক্লাসে কতজন, বয়সভিত্তিক, ধর্মভিত্তিক, উপজাতিভিত্তিক, কতজন শিক্ষক, তাদের কয়টি বেঞ্চ, ফার্নিচার, আইটি ইকুয়েপমেন্ট, খেলার মাঠ আছে কি না, বাউন্ডারি আছে কি না, ওয়াসরুম কয়টি ইত্যাদি ইত্যাদি তথ্য দিতে হয়। জরিপ না করলে বই দেয়া হয় না। বইটা সাংবিধানিক অধিকার (অনুচ্ছেদ ১৭) বিনাপয়সায় পায় শিক্ষার্থীরা। স্কুল কিন্তু সরকার থেকে এক টাকাও পায় না। কিন্তু বই আনার সময় শিক্ষকদের জরিপ আপডেট, কয়েক দফায় বইয়ের চাহিদা দিতে হয়। ব্ই দেয়া হয় সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের দেয়ার পর। একসাথে বই না পাওয়াও যে একটি বৈষম্য এই কথা কর্মকর্তাদের কে বুঝাবে? তারপরও কখনো ৫০%, কখনো ৬০% দেয়া হয়। তারপরও দমিয়ে রাখা যায় না কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীদের।
প্রাথমিক বৃত্তিসহ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে সরকারি প্রাথমিকের তুলনায় কিন্ডারগার্টেনগুলো ভালো করে এজন্য যে, সেখানে শিক্ষার্থী সংখ্যা কম এবং প্রতিযোগিতায় ভালো ফলাফলের মাধ্যমে তাদের মধ্যে টিকে থাকার চেতনা। সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হলেও প্রাথমিকের শিক্ষকদের ফলাফল যা-ই হোক বেতন তো ঠিক আছে প্রবণতা লক্ষণীয়। ২০০৯ সাল থেকে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে অংশগ্রহণের মাধ্যমে কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পরীক্ষায় ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে ‘৫৪ হাজার ৯১৮ শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি পেয়েছে’ শিরোনামে বাংলা নিউজের এক প্রতিবেদনে কিন্ডারগার্টেন ৩য় অবস্থানে (বৃত্তিপ্রাপ্তির হার ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ) থাকলেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান ৫ম (বৃত্তিপ্রাপ্তির হার ২ দশমিক ৪০ শতাংশ)।
অভিভাবকদের মতে, আমার সন্তানও এই দেশের নাগরিক। নিজেকে প্রমাণ করার অধিকার তারও আছে। তার বিদ্যালয় যদি সরকারি নাও হয়, শিক্ষা তো সে একই বই থেকেই নিচ্ছে। একজন শিশুর হাতে নেই তার বিদ্যালয় বাছাইয়ের ক্ষমতা, তার অধিকার রয়েছে মেধা ও পরিশ্রমের আলোকে নিজের প্রতিভা প্রদর্শনের। কিন্তু আজকের এই সিদ্ধান্তে শিশুদের শিক্ষার আলোকে ভাগ করা হচ্ছে, যা নৈতিকভাবে অন্যায় এবং শিক্ষাগত অসাম্যের একটি ভয়ংকর নিদর্শন।
ফ্যাসিস্ট সরকারের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন সাহেব তো মন্ত্রীপরিষদে শপথ নেয়ার তিনদিনের মাথায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকদের সন্তানরা পড়তে পারবে না কিন্ডারগার্টেনে (দেখুন দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৬ জানুয়ারি ২০২১)। এরূপ বৈষম্যমূলক বক্তব্য কী একটি স্বধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী দিতে পারেন? তখন পত্রপত্রিকায়ও এসেছিল, সেই সরকারের অবস্থান। আমাদের প্রচেষ্টা অবিরাম থাকলেও সেই সরকারের প্রতিমন্ত্রীর বিমাতাসূলভ আচরণে বার বার ক্ষতবিক্ষত হয়েছে কোমলমতি শিশুদের নিয়ে দেখা আমাদের স্বপ্নগুলো। তাহলে কী সারাজনম এভাবে বঞ্চিত থাকবে দেশের ৫৫ হাজার কিন্ডারগার্টেনে অধ্যয়নরত কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষৎ? লেখক : সাংবাদিক, কোটা রিটকারী ও কিন্ডারগার্টেন সংগঠক