নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সীমিত সুবিধা নয়, প্রয়োজন সবার জন্য সমান সুযোগ

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৪ minutes ago

Spread the love

বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ এবং ২০৪১ সালের লক্ষ্য অর্জনে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজার ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শুল্ক ও কর সুবিধা যদি সীমিত কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আবদ্ধ থাকে, তবে এর সুফল পুরো খাতে ছড়িয়ে পড়বে না এবং সামগ্রিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই সাধারণ আমদানিকারক, ডিস্ট্রিবিউটর, ইপিসি প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও সুবিধার পরিধি সীমিত হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার প্রত্যাশিত মাত্রায় হবে না। প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষি খাত, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ ভোক্তা সহজ ও সাশ্রয়ীভাবে প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারবে।

বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে উদ্বৃত্ত সক্ষমতা থাকলেও আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ প্রেক্ষাপটে রুফটপ সোলার, সোলার সেচ এবং বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ জাতীয় স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণ ভোক্তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাজারের প্রধান চালিকাশক্তি: বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার কেবল বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রধান চালিকাশক্তি হলো সাধারণ ভোক্তা ও বিভিন্ন খাতের ব্যবহারকারী। আবাসিক রুফটপ সোলার, বাণিজ্যিক ভবন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), কৃষি সেচ পাম্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, টেলিকম টাওয়ার এবং অফ গ্রিড ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এর ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।

দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বড় অংশই সাধারণ জনগণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তাই তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তৃত ও টেকসই সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাজার ব্যবস্থা ও নীতিগত সহায়তা আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া জরুরি।

উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা বাজারকে শক্তিশালী করে: উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক বাজার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের দ্রুত বিকাশের অন্যতম ভিত্তি। যদি শুল্কমুক্ত সুবিধা কেবল কিছু নির্দিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে বাজারে অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য তৈরি হতে পারে। ফলে প্রতিযোগিতা কমে যাবে, প্রযুক্তিগত বৈচিত্র্য সীমিত হবে এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বাজারে প্রবেশ কঠিন হয়ে উঠবে।

বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সফলতার পেছনে রয়েছে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা, যেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সমান সুযোগ পায় এবং ভোক্তারা উন্নত প্রযুক্তি ও প্রতিযোগিতামূলক দামে সুবিধা গ্রহণ করে। অন্যদিকে সীমিত শুল্ক সুবিধা লাখ লাখ সম্ভাব্য রুফটপ সোলার ব্যবহারকারী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, কৃষি ও সেবা খাতকে কার্যত বঞ্চিত করতে পারে। এতে বাজার সম্প্রসারণের বদলে কেন্দ্রীকরণের ঝুঁকি তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে খাতটির টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে।

রুফটপ সোলার সম্প্রসারণে প্রভাব: বাংলাদেশ সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রুফটপ সোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ খাতের সম্প্রসারণের জন্য সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, লিথিয়াম ব্যাটারি, মাউন্টিং স্ট্রাকচার এবং নেট মিটারিং সরঞ্জামের সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়ী মূল্য অত্যন্ত জরুরি। যদি এসব উপকরণের দাম সাধারণ ভোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে যায়, তবে বিনিয়োগের ফেরত পাওয়ার সময় (পেব্যাক পিরিয়ড) বেড়ে যাবে। ফলে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং রুফটপ সোলার স্থাপনের হার কমে যেতে পারে।

কৃষি খাতে সোলারাইজেশন ধীরগতির চরম ঝুঁকি: বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক ডিজেলচালিত সেচ পাম্প এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। কৃষি খাতে সোলার সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ডিজেলনির্ভরতা কমানোর একটি কার্যকর সমাধান। তবে সোলার পাম্প সিস্টেমের প্রধান ব্যয় আসে সোলার প্যানেল, স্ট্রাকচার ও ব্যাটারির মতো উপকরণ থেকে। বাজারে পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা না থাকলে এসব পণ্যের দাম বেশি থাকতে পারে, ফলে কৃষকদের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছাতে দেরি হবে এবং কৃষি খাতে জ্বালানি রূপান্তর প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সীমিত হতে পারে: নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত একটি বিস্তৃত ভ্যালু চেইন তৈরি করে, যেখানে আমদানিকারক, ডিস্ট্রিবিউটর, ইপিসি কোম্পানি, ইনস্টলার, টেকনিশিয়ান, প্রকৌশলী, বিক্রয়কর্মী ও সেবা প্রদানকারীদের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। তবে প্রণোদনা ও সুবিধা যদি সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আবদ্ধ থাকে, তাহলে পুরো ভ্যালু চেইনে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।

অন্যদিকে বর্তমান বাজেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার যে অঙ্গীকার রয়েছে, তা অর্জনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ প্রতিটি নতুন মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই বাড়ায় না, বরং প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান, বিক্রয়কর্মী, ইনস্টলার, পরিবেশক ও সেবা প্রদানকারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।

স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব বনাম দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় লাভ: নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর শুল্ক হ্রাসের (জিরো ইম্পোর্ট ডিউটি) ফলে স্বল্পমেয়াদে সরকারের কিছু রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুফল অনেক বেশি। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমবে ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিও নিশ্চিত হবে। ফলে স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব ক্ষতির তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় লাভ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলে: আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্রুত সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চীন, ভারত, পাকিস্তান, জার্মানি ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো কর ও শুল্ক সুবিধা, নেট মিটারিং ও সহজ অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে এ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

এ দেশগুলোতে কেবল বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, সাধারণ আমদানিকারক, ডিস্ট্রিবিউটর, ইপিসি প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তারাও সমান সুযোগ পেয়েছে। ফলে প্রযুক্তি দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ হয়েছে।

নীতিগত সুপারিশ: বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা জরুরি:

⚫ সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, লিথিয়াম/ব্যাটারি, স্ট্রাকচার, কেবল, কানেক্টর এবং সুরক্ষা সরঞ্জামের ওপর সব আমদানিকারকের জন্য সমান শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করা।

⚫ রুফটপ সোলার ও সোলার সেচ সরঞ্জামের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক যৌক্তিক পর্যায়ে হ্রাস করা।

⚫ নেট মিটারিং প্রক্রিয়া আরো সহজ ও ব্যবহারবান্ধব করা।

⚫ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সবুজ অর্থায়ন (গ্রিন ফাইন্যান্সিং) সম্প্রসারণ করা।

⚫ ওপেক্স, ক্যাপেক্স, আবাসিক ও বাণিজ্যিক সব ধরনের ব্যবহারকারীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।

⚫ স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি আমদানির ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করা।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর শুল্ক ও কর সুবিধা ব্যয় নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে জ্বালানি আমদানি কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, বিদ্যুতের ওপর সরকারি ভর্তুকির চাপ হ্রাস পাবে এবং দেশের কার্বন নিঃসরণ কমবে। তাই বাজেটের মূল উদ্দেশ্য যদি হয় জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা, তাহলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ক্ষেত্রে সব আমদানিকারক ও ব্যবহারকারীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই হবে অধিকতর কার্যকর ও বাস্তবসম্মত নীতি।

আতাউর রহমান সরকার রোজেল: প্রকৌশলী; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) ও চেয়ারম্যান, ফিলামেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড।

  • বাংলাদেশ