টিকটকসহ অনলাইন জুয়া ও ফেইজবুকে আসক্ত হচ্ছে বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ার উঠতি বয়সের শিক্ষার্থীরা

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১ বছর আগে

Spread the love

টিকটক, অনলাইন জুয়া, ফেইসবুক, ইউটিউব আসক্তিতে বর্তমান শিক্ষার্থী ও যুব সমাজকে ভার্চুয়াল অন্ধকার জগতে টেনে নিচ্ছে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম লেখা পড়ার টেবিল ছেড়ে মোবাইলে আসক্ত হচ্ছে। অভিভাবক ও শিক্ষক মহল আতংক এবং দুশ্চিন্তায় পতিত হচ্ছে। বাস্তব পৃথিবী থেকে ভার্চুয়াল পৃথিবী শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ভার্চুয়ালে চলে যাচ্ছে জীবনের মূল্যবান সময়গুলো। মানুষ একা হয়ে পড়ছে। কুমিল্লার বুড়িচংয়ে ঘরের বিছানা থেকে টয়লেট, অলিগলি, অফিস, হাসপাতাল, খেলার মাঠ, রাস্তার পাশে , চা দোকানে অ্যান্ড্রয়েড ফোন হাতে ভার্চুয়ালে আসক্ত হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থী সহ সাধারণ মানুষ। ভার্চুয়াল আসক্তিতে মানুষ, প্রকৃতি ও সামাজিক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করছে। শিশু থেকে উঠতি বয়সীরা ইন্টারনেটে অনলাইন জুয়া, গেমস, টিকটক এসবে ভয়াবহ আসক্ত হয়ে উঠছে। দিনের পর দিন তাদের জীবনের মূল্যবান সময়গুলো ফোনের স্ক্রিনেই কেটে যাচ্ছে। এদিকে ইন্টারনেট খরচ ও জুয়ার টাকা যোগার করতে নিরবে নিঃস্ব হচ্ছে অনেক পরিবার। বাবা মায়ের সাথে থাকে তিন বছরের শিশু লামিয়া। প্রতিদিন তাকে ভাত খাওয়ানোর সময় নিয়ম করে কার্টুনের ভিডিও দেখাতে হবে নয়তো সে খাবেই না। দিনের অন্য সময়েও স্মার্টফোন বা ডেক্সটপে বসে ভার্চুয়ালেই সময় কাটে তার। শিশুর মা সোনিয়া লক্ষ্য করেন দিন দিন তার শিশুটির মধ্যে ভার্চুয়াল আসক্তি বাড়ছে। অনেক দিন পর ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছেন তার আদরের ছোট বোন। তাকে দেখে তার ভাই কুশলাদি সমাপ্ত না করেই ফের ভার্চুয়ালে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ভাইয়ের এমন আচরণ দেখে বোন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। একটি চায়ের দোকানে কয়েকজন বয়সে তরুণ বন্ধুদের একসাথে আড্ডা দিতে দেখা যায়। তারা এক সঙ্গে বসে আছে ঠিকই কিন্তু সবাই যেন গ্যালাক্সির ভেতরে থাকা এক একটি গ্রহের মত একা ও পরষ্পর বিচ্ছিন্ন। তারা সবাই অ্যান্ড্রয়েড ফোন হাতে এক একটি ভিন্ন দুনিয়ার বাসিন্দা। ভার্চুয়াল সমাজে মানুষ বেশি সময় থাকায় বাস্তব সমাজে টানাপড়েন ও সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ছে। মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ভার্চুয়াল সমাজে দায় সাড়া পালন করছে অনেকে। আমির হোসেন বলেন, মানুষ ফোন হাতে ভার্চুয়ালে সময় কাটাচ্ছে। কাছাকাছি থেকেও দিন দিন যেন আমরা পরষ্পর দূরে চলে যাচ্ছি, এটা খুব উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং ভার্চুয়াল সোশাল আইন কাঠামো দরকার। বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শিশু থেকে উঠতি বয়সীরা ইন্টারনেটে গেমস টিকটক এসবে ভয়াবহ আসক্ত হয়ে উঠেছে। দিনের পর দিন তাদের জীবনের মূল্যবান সময়গুলো ফোনের স্ক্রীনেই কেটে যাচ্ছে। টাকা খরচ করে ইন্টারনেটে গেমস খেলছে তারা। তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ নিয়ে চিন্তিত অভিভাবকরা। অনেক তরুণরা ভার্চুয়াল জুয়াতে আসক্ত হয়ে নিরবেই সর্বশান্ত হচ্ছে। একান্ত ফোনের মাধ্যমেই জুয়া খেলা ও লেনদেন হওয়াতে সমাজে নিরব ঘাতক হয়ে উঠেছে ভার্চুয়াল জুয়া। অনেকে গোপনে লোন নিয়ে ভার্চুয়াল জুয়া খেলে নিজের ও পরিবারকে সর্বশান্ত করছে। লাখ লাখ টাকা জুয়া খেলে হেরে পরিবার নিয়ে পথে বসেছে। ভয়ংকর অনলাইন জুয়ার নেশার সমাজে সব বয়সী মানুষ ডুবে যাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনলাইন জুয়ায় আসক্ত ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার কয়েকজন জানায়,অবসর সময় কাটানোর একটা ভালো উপায়। যদিও কিছু টাকা পয়সা খরচ হয়, তবুও সময়টা ভালো ভাবে কেটে যায়। কিছু কর্মজীবি বলেন, টাকা পয়সা ইনকাম করি তো খরচ করার জন্য; তাই বন্ধুদের সাথে সময়টা অতিবাহিত করি এবং আনন্দ উল্লাস করি। কলেজ ছাত্র জাকির বলেন, ফেইসবুক ছাড়া আমার কিছুই ভালো লাগে না। বই পড়ার চেয়ে ফেইসবুক চালাতে অনেক ভালো লাগে। এবদারপুরের গ্রামের মনির বলেন, ভাচুর্য়াল জুয়া আসক্তি দিন দিন সমাজে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমার কাছে অনেকে আসেন অভিযোগ করে বলেন, জুয়া খেলে সব টাকা হারিয়েছে তাদের সন্তানরা। এটা সমাজে ভয়াবহ এক ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে। আসক্তি ঠেকাতে সমাজের মানুষদের সামাজিক ভাবে সচেতন করতে হবে। কুসুমপুর গ্রামের কৃষক মো আজাদ বলেন, গত কয়েক বছর ধরে এলাকার অনেক যুবক ইন্টারনেটে জুয়াতে আসক্ত হয়ে সর্বশান্ত হয়েছে। কৃষি ক্ষেতে বা মিলে কাজ করা শ্রমিকরা দিনশেষে যা মজুরি পায়। ফোনে জুয়া খেলেই তা শেষ করে দেয়। ভরাসার ইঞ্জিনিয়ার এরশাদ গালস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেন, মোবাইল আসক্তি ও তার ভয়াবহতা বর্তমানে অধিকাংশই শিক্ষার্থী ভয়াবহ আসক্তির মধ্যে আছে। তারা মূলত পড়াশোনা বাদ দিয়ে মোবাইল এবং গেম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সময় ব্যয় করে। যা সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ও অনেক সামাজিক সমস্যা তৈরি করছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সের বাচ্চারা একটা প্রেসিনেশন থেকেই মোবাইলে গেমস খেলা শুরু করে। পরবর্তীতে যখন অনলাইন ভিত্তিক গেমসগুলোতে তারা টাকা দিয়ে খেলে এবং একটা পর্যায়ে অনলাইন গেমসের জুয়া খেলে। এই জুয়ার আসক্তি শিক্ষার্থীকে পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। তাছাড়া বাচ্চার হাতে বাবারা মোবাইল ফোন দেয়ার কারণে অধিকাংশ বাচ্চারা অধিকাংশ সময় মোবাইলে সময় ব্যয় করে। ফলে দীর্ঘ সময় মোবাইলে স্কিনে তাকিয়ে থাকার কারণ তাদের চোখের সমস্যা দেখা দেয় এবং একই সাথে মেজাজ খিটখিটে হয়ে পড়ে। বুড়িচং থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, এ ব্যাপারে অপরাধীদেরকে চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযান অব্যাহত আছে। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা জাহান বলেন, এই বিষয়টি এখন আপনার কাছ থেকে জানতে পারলাম। আমি বিভিন্ন প্রোগ্রামে সচেতনতামূলক বক্তব্য রাখবো। এছাড়া অভিভাবক, শিক্ষক ও সুশীল সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট সকল দায়িত্বশীলদের সচেতন হওয়ার আহবান জানাচ্ছি। বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাহিদা আক্তার বলেন, অনলাইন জুয়ার বিষয়ে আমরা অভিভাবকদের ডেকে সচেতন করার চেষ্টা করছি। মোবাইল আসক্তি থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করতে হলে সকলকে সচেতন হতে হবে।

  • বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া