বর্তমানে শহরের সাথে পাল্লা দিয়ে গ্রামের গৃহিনীরা গ্যাসের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় গ্যাসের লাইন সংয়োগ না থাকায় সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের চাহিদা বেড়েছে অনেক। স্বচ্ছ ও অস্বচ্ছল প্রায় প্রতিটি ঘরে গ্যাসের চুলা রয়েছে। এতে দুই উপজেলায় সিলিন্ডার গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন হাট-বাজার ও গ্রামের পাড়া মহল্লায় নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে মুড়ি মুরকির মতো বিক্রয় হচ্ছে গ্যাসের সিলিন্ডার। এতে করে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।তাছাড়া প্রতিনিয়তই ঘটছে অগ্নিকান্ডের ঘটনা। বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়েছে। গত শুক্রবার রাতে গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে অগ্নিকান্ডে বুড়িচংয়ের বারেশ্বর মার্কেটে ১০ দোকান ভস্মীভূত হয়ে কোটি টাকারও বেশি মালামাল ক্ষতি হয়েছে। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বারেশ্বর ফরিদ উদ্দিন ডাক্তার মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ১০টি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কোটি টাকারও বেশি মূল্যের মালামাল। শুক্রবার (৪ জুলাই ২০২৫) রাত সাড়ে ৯টার দিকে মার্কেটের মাহবুবের ফলের দোকান ও আবু খায়েরের গ্যাস সিলিন্ডারের দোকান থেকে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে স্থানীয়রা ধারণা করছেন। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের দোকানগুলোতেও। খবর পেয়ে বুড়িচং ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট এবং স্থানীয় লোকজন প্রায় দুই ঘণ্টার বেশী সময়ের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এসময় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হোসেন। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানদারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আবু খায়ের ট্রেডার্সে গ্যাস সিলিন্ডার, চুলা, নগদ টাকা মিলিয়ে ক্ষতি প্রায় ১৫ লাখ টাকা, মাসুদ স্টোরে প্রায় ১৫ লাখ টাকা, মহসিন ট্রেডার্সে ১৫০ বস্তা চাল ও সারসহ ক্ষতি প্রায় ৭ লাখ টাকা, সুমন স্টোরে ক্রোকারিজ ও মুদি মালামাল মিলিয়ে ১৫ লাখ টাকা, কামরুল হাসান মেকানিক্যাল ফ্রিজ মেরামত দোকানে ৩ লাখ টাকা, হাসান ভূঁইয়া ইলেকট্রনিক্সে ১০ লাখ টাকা, চন্দন শীলের সেলুনে ৩ লাখ টাকা, মনির হোসেনের হোমিওপ্যাথিক দোকানে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধী মিজান ও বজলু মিয়ার ইলেকট্রনিক্স দোকানে প্রায় ৫ লাখ টাকা, মারিয়া খেলা ঘর এন্ড ফ্যাশন ৬ লাখ টাকা, ইকবাল কনফেকশনারী সহ অন্যান্য দোকানে প্রায় ৫ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী গোলাম কিবরিয়া, কাউছার নয়নসহ অনেকেই জানান, অগ্নিকান্ডে গ্যাসের দোকান, পাইকারি চাল ও সারের দোকান, খেলার সামগ্রী, ক্রোকারিজ, ইলেকট্রনিক্সসহ অন্তত ১০টি দোকান পুড়ে গেছে। ফল দোকানদার মাহবুব বলেন,“ঘটনার সময় আমি কুমিল্লা শহরে ছিলাম। খবর পেয়ে দ্রæত চলে আসি, এসে দেখি আমার লক্ষাধিক টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমরা তিন ভাই ২৫ বছর ধরে এই মার্কেটে ব্যবসা করছি। প্রতিবন্ধী মিজান কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান,“আমার দুইটি পা নেই, ইলেকট্রনিক্স মেরামত করে কোনমতে সংসার চালাতাম। এখন দোকানটিও শেষ। স্ত্রী আর দুই মেয়ে নিয়ে বাঁচব কিভাবে, কিছুই বুঝতে পারছি না। সরকারের সহযোগিতা দরকার। বুড়িচং ফায়ার সার্ভিস স্টেশন কর্মকর্তা কফিল উদ্দিন জানান,“তিনটি ইউনিট নিয়ে দ্রæত আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়। আগুনে ১০টি দোকান সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব পরে জানানো যাবে। এ বিষয়ে বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর হোসেন বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছি, ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোর তালিকা জেলা প্রশাসকের দপ্তরে পাঠানো হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহযোগিতার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করার জন্য যে নিয়ম-কানুন রয়েছে, তা অনেকেই মানছেন না। অনেকেই দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ করে রাখছেন এবং তা বিক্রি করছেন। এতে করে অগ্নিকান্ড বা বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সিলিন্ডার একটি বিস্ফোরক পদার্থ এবং এটি সংরক্ষণে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির জন্য অবশ্যই বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিতে হবে এবং সেই অনুযায়ী সংরক্ষণ করতে হবে। তবে, বুড়িচং ও ব্রাহ্মণাপাড়া উপজেলায় গ্যাস সিলিন্ডার যত্রতত্র বিক্রি হওয়ায় স্থানীয়রা উদ্বিগ্ন। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে এই বিষয়ে দ্রæত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।