২০২৩ সালের আগষ্ট মাসে বন্ধ হয়েছে এমএলএম ব্যবসার ফাঁদ অবৈধ অনলাইন গ্যাম্বলিং ক্রিপ্টো ট্রেডিং করা দুবাই ভিত্তিক কোম্পানি “এমটিএফই”। এমটিএফই এর প্রতারণায় জড়িয়ে সর্বস্ব খুইয়েছে দেশের প্রায় লক্ষাধিক যুবক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ। ধারণা করা হয়েছিল-তৎকালীন সময় এই কোম্পানির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ক্রিপ্টো কারেন্সির মাধ্যমে অন্তত ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছিল। ২০২৩ সালের ১৮ আগষ্ট শুক্রবার রাতে এই কোম্পানিতে বিনিয়োগকারী একাধিক ব্যক্তি জানান, হঠাৎ করে কোম্পানিটি বন্ধ হয়ে গেছে। সাইবার বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত ও বাংলাদেশ থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে উল্লেযোগ্য সংখ্যক বিনিয়োগকারী ছিল। তবে অধিকাংশই ছিল বাংলাদেশি। কোম্পানিটির সার্ভার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলাবাহিনীসহ প্রশাসনের টনক নড়েছিল। এমটিএফই বিভিন্ন এলাকার সিইও’দেরকে আটক করার জন্য অভিযান চালিয়েছিল। দেশের প্রায় কয়েকশত প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সিইও তখন আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল। এই নিয়ে দেশের মিডিয়া ও প্রশাসনের লোকজন কয়েক মাস হৈচৈ করার পর ঠান্ডা হয়ে যায়। বিনিয়োগকারীরাও এই বিষয় নিয়ে আর কোন রকম আলাপ আলোচনা না করে নিজেদের মতো করে চলতে শুরু করে। কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর এমটিএফই এর পুরাতন কর্মীরা আবারও সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বুড়িচং-ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সক্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে। তারা অতি গোপনে আবারও এমটিএফই এর মধ্যে বিনিয়োগ করে ট্রেডিং চালু করেছে। পূর্বে বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্থ এক বিনিয়োগকারী জানান, ভাই সুযোগ যেহেতু পেয়েছি কম টাকা বিনিয়োগ করেছি। দেখি কম কম করে পূর্বে টাকাগুলো উদ্ধার করতে পারি কি না। বিশেষ করে উঠতি বয়সের ছেলেরা এই ব্যবসার সাথে জড়িত হচ্ছে। এই ব্যবসাটি করতে হলে একটি এনড্রয়েট মোবাইল ফোন থাকলেই হলো আর তার সাথে কিছু ডলার। বাইনান্স নামে একটি এ্যাপস এর মাধ্যমে টাকাকে ডলারে রূপান্তর করে এমটিএফই এর একাউন্টে বিনিয়োগ করে। প্রতিদিন ট্রের্ড খোলে এবং বন্ধ করে। এতে করে প্রতিদিনই ডলার যোগ হয়। এই লোভনীয় ব্যবসার অফার পেলে যে কেউ ফাঁদে পা দিয়ে ফেলে। তাছাড়া বাংলাদেশে জুয়া খেলা নিষিদ্ধ হলেও জুয়ার পুরাতন পদ্ধতি বাতিল করে নতুন পদ্ধতিতে অনলাইনে ডিজিটাল জুয়া খেলা তরুন ও যুবকদের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে। মোবাইল ফোন সহজলভ্য হওয়ায় প্রযুক্তির বদৌলতে সারাদেশে অনলাইন জুয়া মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার প্রত্যেকটি পাড়া মহল্লায় এই জুয়া খেলা ছড়িয়ে পড়েছে। ক্রিকেট-ফুটবল খেলা থেকে শুরু করে নানান ধরনের খেলার ফলাফল বা অন্য কিছু নিয়ে বাজি ধরে বিজয়ীকে অর্থ বা মূল্যবান বস্তু আদান-প্রদান করা হয়। অনলাইনে শত শত জুয়ার সাইড রয়েছে। ওয়ানএক্সবেট, বেটউইনার, বেট৩৬৫, মেলবেট, প্যারিম্যাচ সাইডসহ শতাধিক সাইডে জুয়া হালে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব জুয়ার সাইটের বিজ্ঞাপন যেমন বাংলাদেশের কিছু বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেখা যায়, তেমনই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলগুলোয় প্রচার হতেও দেখা যাচ্ছে। ক্রিকেটার তারকা ও সিনেমা-নাটকের প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা- অভিনেত্রীদের এ জুয়ার বিজ্ঞাপনে দেখা যায়। এতে করে স্কুল, কলেজ, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ তরুণ প্রজন্ম প্রভাবিত হয়ে জুয়া খেলায় আসক্ত হচ্ছে। জুয়া খেলা আইন ও সামাজিক দৃষ্টিতে অপরাধ। একসময় জুয়া খেলতে সরাসরি দেখা যেত। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই জুয়া ডিজিটাল মাধ্যমে নতুন রূপ পেয়েছে। এখন ঘরে বসেই জুয়া খেলা যায়। অনলাইন জুয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অথবা অন্য কোনো অনলাইন, ইলেকট্রনিক, ডিজিটাল মাধ্যমে খেলাধুলার নামে বাজি ধরা হয়। বাজি ধরা ছাড়াও অর্থ কিংবা পণ্যের বিনিময়ে প্রতিযোগিতা, লটারি, অর্থ বা আর্থিক মূল্যমানের কোনো পণ্যের বিনিময়ে ভাগ্য কিংবা দক্ষতার সংমিশ্রণে কোনো আর্থিক ঝুঁকিপূর্ণ খেলা ইত্যাদি জুয়ার অন্তর্ভুক্ত। বাজির লেনদেনের জন্য জুয়াড়িরা ক্যাশবিহীন ব্যাংকিং লাইন তথা ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড এবং মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন (বিকাশ, রকেট, নগদ, উপায়, পেপাল ইত্যাদি) হয়ে থাকে। যুবসমাজ ধ্বংসের জন্য এখন মারাত্মক এক প্ল্যাটফর্মের নাম অনলাইন জুয়া, যা বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়ছে পাড়া, মহল্লা, গ্রামাঞ্চলের চায়ের দোকান পর্যন্ত। এমন বিধ্বংসী খেলার নেশায় সর্বশান্ত হয়ে ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে সামাজিক অবক্ষয়। অর্থনৈতিকভাবেও সর্বশান্ত অনেক পরিবার। মারামারি থেকে খুনের ঘটনাও ঘটছে অনেক। সমাজ ও পরিবারে বাড়ছে অশান্তি । অভিভাবক ও সচেতন মহলে বাড়ছে উদ্বেগ। দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত এসব অনলাইন জুয়ার টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হচ্ছে বিদেশে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে টাস্কফোর্স গঠিত করে কাজ করলে সুফল লাভ করা সম্ভব। অনলাইনভিত্তিক লুডু, ক্যারম তরুণদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় হলেও পাবজি গেইম, ফ্রি-ফায়ারসহ শতাধিক গেমে আসক্ত হচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা। তাই এই সব জুয়ার ফাঁদ থেকে কিশোর ও উঠতি বয়সী তরুন এবং বিভিন্ন পেশার মানুষকে রক্ষা করতে হলে স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি বৃদ্ধি করতে হবে বলে সচেতন মহল মনে করেন।