কুমিল্লার বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়ায় ছোঁয়াচে চর্মরোগ স্ক্যাবিস ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বন্যা-পরবর্তী সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবে আক্রান্ত একজনের মাধ্যমে পরিবারের অন্য সদস্যরাও সংক্রমিত হচ্ছেন, ফলে সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসালয়ে রোগীর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, স্ক্যাবিসের সংক্রমণে আতঙ্কিত না হয়ে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে সুস্থ হওয়া সম্ভব। তবে চিকিৎসা না নিলে কিডনি জটিলতা পর্যন্ত হতে পারে। সরেজমিনে বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্র ঘুরে জানা যায়, চব্বিশে এই অঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা প্লাবিত হয়। বন্যার পর দূষিত পানির প্রভাবে অস্বাভাবিক হারে চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। যদিও স্ক্যাবিস আগে থেকেও ছিল, তবে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেক বেশি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, স্ক্যাবিস আক্রান্তদের শরীরের কোমর, আঙুলের ফাঁক, নিতম্ব, যৌনাঙ্গ, ঘাড়, বগলের নিচ, কনুই, নাভি, হাতের তালু ও কবজিতে লাল ফুসকুড়ি দেখা যায়। এসব জায়গায় প্রচন্ড চুলকানি হয়, যা রাতের বেলায় আরও বেড়ে যায়। আক্রান্ত স্থান থেকে তরল পদার্থও বের হতে পারে। সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমেই স্ক্যাবিস প্রতিরোধ সম্ভব। পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ রোগের ভয়াবহতা কমানো যেতে পারে। স্ক্যাবিস হল একটি চুলকানিযুক্ত ত্বকের অবস্থা যা সারকোপ্টেস স্ক্যাবিই, একটি ক্ষুদ্র বরোজিং মাইট দ্বারা সৃষ্ট হয়। স্ক্যাবিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা মাইটের গর্তের জায়গায় তীব্র চুলকানি অনুভব করেন। স্ক্যাবিস হল সারকোপ্টেস স্ক্যাবি নামক ক্ষুদ্র মাইট দ্বারা সৃষ্ট একটি সংক্রমণ। স্ক্যাবিস শরীরের সেই অংশে চুলকানি এবং ফুসকুড়ি সৃষ্টি করতে পারে যেখানে এই মাইটগুলি জমে থাকে। সংক্রমণটি ক্রমাগত চুলকানি এবং তীব্র ফুসকুড়ি সৃষ্টি করে কারণ মাইটগুলি ত্বকের ভিতরে ডিম পাড়ে। রাতে, চুলকানির ইচ্ছা তীব্র হতে পারে। স্ক্যাবিস খুব তাড়াতাড়ি শনাক্ত হলে সহজেই চিকিৎসাযোগ্য। স্ক্যাবিস একটি অত্যন্ত সংক্রামক সংক্রমণ এবং এর মাধ্যমে সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে: শারীরিক স্পর্শ, সংক্রামিত পোশাক এবং বিছানাপত্রের মাধ্যমে । যদিও স্ক্যাবিস সহজে ওষুধের মাধ্যমে নিরাময়যোগ্য, তবে চিকিৎসার পরে বেশ কয়েক দিন পর্যন্ত চুলকানি চলতে পারে। যেহেতু স্ক্যাবিস খুব সংক্রামক, তাই ডাক্তাররা পরামর্শ দেন যে, যে কেউ স্ক্যাবিস-সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসে তার চিকিৎসা করা উচিত। আপনি যদি ত্বকে অস্বাভাবিক চুলকানি বা ফুসকুড়ি অনুভব করেন তবে আজই আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন। স্ক্যাবিসের লক্ষণগুলি হলো স্ক্যাবিসের প্রাথমিক সংস্পর্শে আসার চার থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত স্ক্যাবিসের লক্ষণগুলি স্বীকৃত নাও হতে পারে। অনিয়মিত, পাতলা গর্তের ট্র্যাকগুলি আপনার ত্বকে ছোট ছোট ফুসকুড়ি বা ফোসকা দিয়ে তৈরি স্ক্যাবিসের বৈশিষ্ট্য এবং এই ট্র্যাকগুলি বা বরোজগুলি সাধারণত ত্বকের ভাঁজে দেখা যায়। যদিও শরীরের প্রায় সমস্ত অংশ জড়িত থাকতে পারে, সাধারণ এলাকাগুলি হল:আঙ্গুলের মাঝে,বগলে, কোমরের চারপাশে,কব্জির ভিতর বরাবর, ভিতরের, কনুই উপর, পায়ের তলায়, স্তনের চারপাশে, পুরুষের যৌনাঙ্গের চারপাশে, পাছার উপর, হাঁটুতে। তাছাড়া চুলকানি, বিশেষ করে রাতে, ঘামাচির কারণে ফোসকা এবং ঘা, শিশু এবং বয়স্কদের চুলকানির প্রবণতা বেশি। স্ক্যাবিসকে অন্য চর্মরোগের মতো ভুল করা যেতে পারে ব্রণ বা প্রাথমিক পর্যায়ে মশার কামড় কারণ ফুসকুড়ি একই রকম দেখা যায়। ক্রমাগত চুলকানি স্ক্যাবিসের লক্ষণ। লোকেরা সহজেই এই মাইটগুলি এক ব্যক্তির থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে স্থানান্তর করতে পারে। যেসব মাইটস স্ক্যাবিস সৃষ্টি করে তারা তাদের চারপাশের প্রতি সংবেদনশীল; তারা শুধুমাত্র একটি হোস্ট শরীরে প্রায় ২৪-৩৬ ঘন্টা বেঁচে থাকতে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিরা হলেন, যৌন সক্রিয় প্রাপ্তবয়স্করা, শিশু, ছোট বাচ্চাদের মা, যারা নার্সিং-হোম-সহায়তা লিভিং কমিউনিটি, এবং দীর্ঘমেয়াদী যতœ প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কারাগারের মতো বদ্ধ স্থানে থাকে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মামুন জানায়, তার সারা শরীর চুলকায় এবং লাল হয়ে যায়। তাই চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসেছে। উপজেলার শিদলাই ইউনিয়নের লাড়ুচৌ এলাকা থেকে আসা আমজাদ হোসেন জানান, তার ২৩ মাস বয়সী মেয়ে তানহার হাত ও শরীরে লাল লাল গোটা দেখা দেয়। একইভাবে ৪ বছর বয়সী সিনথিয়া জান্নাতকে চিকিৎসা করাতে নিয়ে আসেন তার মা বিলকিস আক্তার। পল্লী চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ ব্যবহার করেও আরোগ্য না পাওয়ায় তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছেন। হাসপাতালে দেখা গেছে, অনেক শিশু স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছে। তাদের অভিভাবকরা বলছেন, শরীরের বিভিন্ন অংশে লাল লাল দানার মতো র্যাশ উঠছে, যা প্রচন্ড চুলকায় বিশেষ করে রাতে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি আরিফ আহমেদ মাহাদি জানান, তিনি বুড়িচং সরকারি হাসপাতালের গেটের পাশে ওষুধের ব্যবসা করেন। সাম্প্রতিক সময়ে স্ক্যাবিস আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে বলে তিনি অভিজ্ঞতা থেকে জানান। বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মালেকুল আফতাব ভূঁইয়া জানান, বন্যা-পরবর্তী সময়ে স্ক্যাবিসের প্রকোপ অনেক বেড়েছে। অধিকাংশ আক্রান্ত শিশু। সঠিক চিকিৎসা না হলে কিডনি জটিলতার আশঙ্কা থাকে। তাই পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদেরও একসঙ্গে চিকিৎসা নিতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জামসহ রোগীদের চিকিৎসা দিতে প্রস্তুত।” ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শেখ হাসিবুর রেজা বলেন “স্ক্যাবিস একটি পরজীবীজনিত চর্মরোগ, যা সারকোপটিস স্ক্যাবিয়াই নামক পরজীবীর কারণে হয়ে থাকে। এটি খুবই ছোঁয়াচে। তাই পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে চিকিৎসা নিতে হবে এবং ব্যবহৃত কাপড়, বিছানা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।”