টুকরো টুকরো ছবি দিয়ে গল্পের মালা গাঁথে মুনেম ওয়াসিফ

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৩ years ago

Spread the love

ছোটবেলায় ক্যালেন্ডারের পাতায় দেখা রঙিন একটি চা-বাগানের ‘পিকটোরিযাল’ ছবি বহু বছর মনের মধ্যে গেঁথে ছিল। পড়ন্ত বিকেলের আলোতে ছায়াবৃক্ষের আলোছায়ায় বিস্তৃত চা-বাগান আর চা-বাগানের নারীশ্রমিকের হাস্যোজ্বল চেহারায় চা-পাতা তোলার দৃশ্য ছিল সেটি। পাঠশালার প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে অনুজ আলোকচিত্রীদের কাজ দেখার আগ্রহ থাকত সব সময়। তেমনিভাবে একদিন। তরুণ আলোকচিত্রী মুনেম ওয়াসিফের চা- বাগানের শ্রমিকদের নিয়ে কাজ দেখে চমকে উঠি। তার কাজ আমার মনের সেই লালিত ছবিটি মন থেকে মুছে দেয়। সেখানে জায়গা করে নেয় ওয়াসিফের সাদা- কালোতে, রংহীন চা-শ্রমিকদের জীবন। যেখানে দেখতে পাই এক নারীশ্রমিক বৃষ্টিতে পোকার কামড়রের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় যন্ত্রণাকাতর মুখে চা-পাতা তুলছে, ম্যানেজারের বাবুর্চি এক গøাস পানি খেয়ে সেহরি করছেন, ১১৩ বছরের বৃদ্ধ চা-শ্রমিক বাড়তি মজুরির ৬০-৬৫ হাজার টাকা এখনো বুঝে পাননি, মুক্তিযুদ্ধ করে পাকিস্থানিদের পোঁতা মাইনে দুই পা হারানো এক চা-শ্রমিক। এমনিতর অনেক ছবি। টেলিভিশনের রঙিন মোড়কে চা- পাতার বিজ্ঞাপনে বিমোহিত হই আমরা। আর চা-পাতার ভাঁজে ভাঁজে চা-শ্রমিকদের ক্লিশে জীবনটাই তুলে ধরেছে ওয়াসিফ তার কাজের মধ্য দিয়ে। চা-পাতার মতোই লাভজনক আরেকটি রপ্তানিযোগ্য পণ্য চিংড়ি। সাতক্ষীরায় মাইলের পর মাইল ধানের জমি পানিতে নিমজ্জিত। লবণাক্ত পানি ছাড়া চিংড়ি চাষ। হয় না। বর্ধিত চিংড়ি চাষ প্রকল্পের কারণে খাবার পানির সংকট দেখা দেয়। লবণাক্ত পানির কারণে বাড়ছে অসুখ-বিসুখ। ধানের চাষিরা রূপান্তরিত হচ্ছেন খন্ডকালীন শ্রমিকে। লবণাক্ত পানির প্রভাব ওয়াসিফের শক্তিশালী আরেকটি কাজ। ওয়াসিফ সেই ভুক্তভোগী মানুষদের দুঃখ- কষ্টের মুহূর্তগুলোর বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তার ছবিতে। ছবিগুলো লবণাক্ত পানির প্রভাবের উল্লেখযোগ্য স্বাক্ষর। একটি ছবিতে এক নারী যিনি আগলে ধরে আছেন লিভার ক্যানসার আক্রান্ত স্বামীকে, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া দৃশ্য। আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, কিছু মানুষ কয়েকটি নৌকা ভাটার সময় টেনে নিয়ে যাচ্ছে। নৌকার ওপর কিছু কনটেইনার, সেই কনটেইনারে খাবার পানি। প্রতিদিন এভাবেই দূর-দূরান্ত থেকে, গভীর সুন্দরবনের দুর্গম এলাকায় বাঘ ও জলদস্যুদের উপেক্ষা করে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয় স্থানীয় নারী-পুরুষের। সেই পানি নিয়ে ঘরে পৌঁছাতে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টাও লেগে যায় প্রতিদিন। ভাটার সময় কর্দমাক্ত কাদায় হেঁটে নৌকা টেনে নিয়ে যাওয়ার সেই দৃশ্য যন্ত্রণা দেয় মনকে। দুক নিউজে ওয়াসিফকে যখন সহকর্মী হিসেবে পাই তখন সে খুলনার ‘পাট শ্রমিকদের সংগ্রাম’ নিয়ে কাজ করছে শিক্ষক আবীর আবদুল্লাহর অনুপ্রেরণায়। ১৯৯৬ সালে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের চাপে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় পাটকল গুটিয়ে ফেলার। তারই পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচটি জুট মিল বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭ সালে খুলনার সেই ফুঁসে ওঠা পাটকল শ্রমিকদের নিয়ে ছবির গল্প গাছে ওয়াসিফ। ওয়াসিফ নিজেকে ফটোসাংবাদিক বলার চেয়ে ফটোগ্রাফার বলাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। মুনেম ওয়াসিফ বিশ্বাস করে বাংলাদেশ এমন একটা দেশ যেখানে মানুষের শেষ নেই, বঞ্চনা ও আবেগের শেষ নেই, গল্পেরও শেষ নেই। তাই ভিনদেশি বিষয়বস্তু তাকে টানে না। নিজের শৈশবকে খুঁজতে গিয়ে ওয়াসিফ পুরান ঢাকার অলিন্দে ঘুরে বেরাচ্ছে ক্যামেরা হাতে চার বছরের অধিক সময় ধরে। পুরান ঢাকার দৈনন্দিন জীবনের ছবিগুলো এক কাব্যময় গল্পগাথা। মুনেম ওয়াসিফের ছবির সবচেয়ে শক্তিশালী বিষয় মোমেন্ট বা মুহূর্ত। তার ছবিগুলো দেখতে দেখতে আমার আরেকজন প্রিয় আলোকচিত্রী কার্ডিয়ার ব্রেসোর কথা মনে পড়ে যায়। ব্রেসোর ডিসেসিভ মোমেন্ট’-এর প্রচুর উদাহরণ পাই ওয়াসিফের ছবিতে। ব্রেসো বলেছিলেন, ফটোগ্রাফি পেইন্টিং নয়। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের সৃজনশীলতাই মোমেন্টের জন্ম দেয়। সঠিক জায়গা এবং সঠিক সময়ে আলোকচিত্রী তাঁর চোখ এবং তাঁর ইনটুইশন বা সজ্ঞা দিয়ে অনুভব করবেন কখন দুর্লভ মুহূর্তটি ঘটবে, ঠিক সেই মুহূর্তে ক্লিক করতে পারলেই “ডিসেসিভ মোমেন্ট’ পাওয়া যাবে। মুনেম ওয়াসিফের প্রায় সব ছবিতেই আমি সেই “ডিসেসিভ মোমেন্ট’ পাই। আরও পাই স্পেসের ব্যবহার। এখনকার প্রজন্ম বিষয়বস্তুর চেয়ে আঙ্গিক নিয়ে বেশি ভাবে। মুনেম ওয়াসিফ এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। সে আঙ্গিকের চাইতে বিষয়বস্তুকে বেশি প্রাধান্য দেয়। এ বয়সেই মুনেম ওয়াসিফের প্রাপ্তির তালিকাটা বেশ বড়সড়। ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোতে জুপ স্টুয়ার্ড মাস্টার ক্লাসে গ্র্যান্ড। ফ্রান্সের প্যাপিনিয়ন শহরে অনুষ্ঠিত পৃথিবীর বিখ্যাত ফটো উৎসব ‘ভিসা পলিম্যাটে ইয়াং রিপোর্টার অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হওয়া। ফ্যাবরিকা এফ ২৫ প্রাইজ, ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফার হিসেবে ফ্রেন্স ফটো এজেন্সি ‘ভু’ তে আলোকচিত্রী হিসেবে বর্তমানে কাজ করছে। পাশাপাশি মুনেম পাঠশালায় ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির শিক্ষক । মুনেম ওয়াসিফের ছবি প্রকাশিত হয়েছে পৃথিবীখ্যাত পত্রিকা গার্ডিয়ান, লা মঁদে, পলিটিক্যাল, ডেইজ জাপান, দু, এলএস প্রেমেতে। আর তার ছবির প্রদর্শনী হয়েছে সুইজারল্যান্ডে, জাপানের টোকিও মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম, নেদারল্যান্ডসের কুলখাল মিউজিয়াম, ফ্রান্সের প্যালেস দ্য টোকিও, লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল গ্যালারিতে। ওয়াসিফের প্রথম বই সল্ট ওয়াটার টিয়ার্সফ্রান্স থেকে প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। যে ছবিটি সংবাদ হয়ে পত্রিকার পাতায় উঠে থেমে যায়, ওয়াসিফ যাত্রা শুরু করেন সেখান থেকেই। আমরা খালি চোখে চারপাশের জীবনকে দেখি রঙিন। এই রঙিন জীবনেই যাদের জীবনে রং পৌঁছায়নি তারা ওয়াসিফের ক্যামেরায় সাদা-কালোতে ধরা দেয়। প্রতিটি ছবির নান্দনিক কম্পোজিশন, আলোছায়া ক্যামেরায় দৃষ্টিকোণ হৃদয়ে নাড়া দেয়। ওয়াসিফের ছবিগুলো সুন্দর, একই সঙ্গে বেদনা জাগায়, অর্গল খুলে দেয় বিষয়বস্তুর গহিনে প্রবেশদ্বারের। টুকরো টুকরো ছবি দিয়ে গল্পের মালা গাঁথে ওয়াসিফ, সেই মালার পরতে পরতে মানবতা নিষ্প্রেষণের গল্প। সেই মানুষদের মুখের নির্বাক, ভাবলেশহীন, উৎকণ্ঠিত নানা ধরনের অভিব্যক্তি আমাদের কাছে বিষয়বস্তুকে স্পষ্ট করে তুলে ধরে, ভেতরের আবেগকে নাড়া দিয়ে আত্মাকে ছুঁয়ে যায়, একই সঙ্গে আমাদের উদাসীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সচেতন করে তোলে। উসকে দেয় ভাবনার জগৎকে। খনন করে চলে মনোজগৎকে। এখানেই ওয়াসিফের সার্থকতা। এভাবেই তার কাজ ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়েছে, সাংস্কৃতিক বলয় পেরিয়ে মিশে যায় সারা পৃথিবীর মানবেতর যাপিত জীবনের সঙ্গে।

  • ব্রাহ্মণপাড়া