এক সময়ের খরস্রোতা গোমতী এখন মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। উজানের পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গোমতী তার যৌবন হারিয়ে বৃদ্ধায় পরিণত হয়েছে। আগের মতো রূপ যৌবন আর নেই। সবুজের সমারোহ নেই। কৃষকের আনাগোনাও নেই। আছে শুধু রাতের আধাঁরে মাটি কাটার ট্রাক্টরের শব্দ। গোমতীর পাড়ের মানুষগুলো বর্ষাকালে বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার ভয়ে নির্ঘূম রাত কাটাতো আর এখন মাটি কাটার ট্রাক্টরের শব্দে নির্ঘূম রাত কাটায়। যেই গোমতীর চরে শত শত কৃষক সব্জির চাষ করে জীবনের স্বপ্ন দেখতো, আজ সেই কৃষকের মনে শুধু হা-হা কার। মাটি কাটার সিন্ডিকেটের সদস্যদের ভয়ে কথা বলতে পারছে না। চোখের সামনেই উজাড় হয়ে যাচ্ছে সব্জি চাষের জমিগুলো। মাটি খেকু শকুনগুলো গোমতীর চরটিকে ক্ষত বিক্ষত করে ফেলেছে। এই নদীর দু’তীরের চরাঞ্চলকে জেলার শস্যভান্ডার বলা হয়। প্রতিবছর উজান থেকে আসা পলিতে উর্বর হয় গোমতীর চর। আর সেই চরে বছরব্যাপী ফসল ফলানোর স্বপ্ন দেখতো কৃষক। সাম্প্রতিক সময়ে মাটি কাটার সিন্ডিকেটের সদস্যরা এতোই বেপরোয়া যে, দিন রাত চরের মাটি কাটছেই। কোন ভাবেই বন্ধ হচ্ছে না মাটি কাটা। ফলে সবুজের সমারোহ সবজির ভান্ডার গোমতীর চর এখন ধূ-ধূ বালুচর। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবাধে গোমতীর চরাঞ্চল থেকে মাটি কেটে বিক্রি করায় কৃষকরা চাষাবাদ করতে পারছে না। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে প্রতিরক্ষা বাঁধ,বায়ু ও শব্দ দূষনে নদীপাড়ের মানুষের দুর্ভোগ চরমে। সরেজমিন ঘুরে ও বিভিন্ন সুত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, জেলার প্রধান নদী গোমতী । ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন নদীটি কুমিল্লার কটকবাজার সীমান্ত দিয়ে কুমিল্লায় প্রবেশ করে কুমিল্লা সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া,দেবিদ্বার, মুরাদনগর, তিতাস হয়ে দাউদকান্দির সাপটায় মেঘনা নদীর সাথে মিলিত হয়। নদীর দু’তীরে রয়েছে বিস্তৃর্ণ চরাঞ্চল। প্রতিবছর উজান থেকে আসা পালির সাথে বিপুল পরিমান পলি বহন করে নদীর দু’তীরের চরাঞ্চলকে উর্বর করে। আর সেই চরে সারা বছর চাষাবাদ করে ভাগ্য পরিবর্তনে ব্যস্ত সময় পার করার স্বপ্ন দেখে কৃষক। এই চরে ধান, পাট, গম, সরিষা, শীতকালীন বিভিন্ন শাকসব্জি, আখ, বারো মাসী মুলা উৎপাদন হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে মাটি খেকোরা এতটাই বেপরোয়া যে, রাতের আধাঁরে তারা এস্কেভেটর দিয়ে অবাধে মাটি কেটে ডাম্প ট্রাকযোগে বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষকরা প্রতিবাদ করলে হামলা-মামলাসহ নানা ভাবে হয়রানীর শিকার হতে হচ্ছে। পাশাপাশি ভারি ডাম্পট্রাকযোগে মাটি পরিবহনের ফলে গোমতীর প্রতিরক্ষা বাঁধও বিভিন্নস্থানে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষকদের স্বার্থ, প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষায় কুমিল্লা জেলা ও জেলার বিভিন্ন উপজেলা প্রশাসন গোমতীর চরাঞ্চল থেকে মাটি কাটা ও নদী থেকে বালু উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা জারী করে। এতে মাটি খেকোরা দিনে মাটি কাটা বন্ধ রাখলেও সন্ধ্যার পর থেকে সকাল পর্যন্ত মাটি কাটা অব্যাহত রাখছে। কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুর (উত্তর) ইউনিয়নের আমতলী এলাকায় আলমগীর, ইয়াকুব, মিজান, রিপন, মোস্তফা, মনির, বায়েজিদ, হালিম, মাসুদ, বুড়িচংয়ের ময়নামতি ইউনিয়নের বাগিলারা এলাকায় আমির হোসেন,তপনসহ ৪/৫ জনের একটি সিন্ডিকেট,ষোলনল ইউনিয়নের মিথিলাপুর এলাকায় সাবেক ইউপি সদস্য এরশাদ মেম্বারের নেতৃত্বে একই উপজেলার কাহেতরা অংশে সুমনসহ সদর উপজেলার আলেখারচর, পালপাড়া, বুড়িচংয়ের মীরপুর, গোবিন্দপুর অংশে প্রশাসনের চোঁখ ফাঁকি দিয়ে মাটি কাটা চক্র রাতের আধারে অবাধে মাটি কাটা অব্যাহত রাখছে। এতে চরাঞ্চল যেমন কৃষক শুন্য হয়ে পড়ছে, তেমনি প্রতিরক্ষা বাঁধ হুমকীর মুখে, পাশাপাশি শব্দ ও বায়ূদূষনে চরম দুর্ভোগ মানুষের। এবিষয়ে নদীর আমতলী ও বাগিলারা এলাকার একাধিক কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আমরা প্রভাবশালী মাটি খেকোদের ভয়ে প্রতিবাদ করতে সাহস পাই না। বিষয়টি জানতে চাইলে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমেন শর্মা বলেন, গোমতীর আমতলী অংশে কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে শর্ত সাপেক্ষে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শর্তের বরখেলাফ করলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো। বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোসাঃ সাহিদা আক্তার বলেন, আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। ২৩ মার্চ অভিযান চালিয়ে দুটি গাড়ী আটক করেছি। কিন্ত সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা না থাকলে গোমতীর মাটি কাটা বন্ধ করা যাবে না। সেই সাথে জনগণকে সচেতন হতে হবে।