কুমিল্লায় স্কুল কলেজ ও মাদরাসার গভনিং এবং ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে বিপাকে উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তাসহ উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাগণ। জুলাই-আগস্টে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফলে বিগত ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা পাশের দেশ ভারতে পালিয়ে যায়। সেই সাথে সাথে তার সরকারের এমপি, মন্ত্রী, উপজেলা চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশনের মেয়র, পৌর মেয়রসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা- কর্মী এবং বিভিন দপ্তরের দায়িত্বশীল ও স্কুল- কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরাও পালিয়ে যায়। যার ফলে সকল স্কুল, কলেজ, মাদরাসা এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গভনিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রি বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগ বেসরকারি মাধ্যমিক-১ শাখা হতে গত ২৪ আগষ্ট সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের স্বাক্ষরিত একটি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা পরিচালনা করার জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে কমিশনার, জেলা পর্যায়ে ডিসি, উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও এবং তাদের মনোনীত প্রতিনিধিকে সভাপতির দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তারপর গত ১৮ নভেম্বর একই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সাইয়েদ এ, জেড মোরশেদ আলী স্বাক্ষরিত আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ডকে অনুরোধ করা হয় কলেজ পর্যায়ে এডহক কমিটির সভাপতি স্নাতকোত্তর এবং স্কুল পর্যায়ের সভাপতি স্নাতক পাস ব্যাক্তিকে সভাপতি করে এডহক কমিটি গঠন করতে এবং এই কমিটি ৬ মাসের মধ্যে নিয়মিত কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তারপর ২৪ নভেম্বর একই মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব সাইয়েদ এ, জেড মোরশেদ আলী স্বাক্ষরিত আরেকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং ৯ম গ্রেডে কর্মরত সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্য হতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মনোনীত ব্যাক্তিকে সভাপতি করে এডহক কমিটি করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত১ ডিসেম্বর একই মন্ত্রণালয়ের একই বিভাগ হতে উপ-সচিব সাইয়েদ এ, জেড মোরশেদ আলী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গত ২৪ নভেম্বর জারিকৃত প্রজ্ঞাপন রহিত করে এবং গত ১৮ নভেম্বর জারিকৃত প্রজ্ঞাপন প্রতিস্থাপন করে কার্যকরের নির্দেশ প্রদান করা হয়। একই বিষয়ে একই মন্ত্রণালয় থেকে পরপর ৪টি প্রজ্ঞাপন জারি করে ভিন্ন ভিন্ন নির্দেশনা প্রদান করায় কমিটি গঠন নিয়ে মাঠ পর্যায়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয়দের মাঝে শুরু হয়েছে বানরের রুটি ভাগাভাগি নিয়ে টানাটানি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন দলীয় গ্রæপিং, বৈষম্য বিরোধী ছাত্রআন্দোলনের নেতা কর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে দ্বিধাদ্বদ্ধের। প্রত্যেকটি গ্রæপ কিংবা রাজনৈতিক দল এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা কর্মীরা চাচ্ছে তাদের পছন্দ অথবা মনোনীত ব্যাক্তিকে এডহক কমিটির প্রধান ও অন্যান্য সদস্যের পদে বসাতে। এতে চাপেমুখে রয়েছেন বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার সুপার, প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষরা। তাছাড়া উপজেলা পর্যায় থেকে কমিটির নামের তালিকা প্রেরণ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন ইউএনও রা। বিভিন্ন পর্যায়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুপারিশ, দলীয় প্রভাবশালী নেতাদের তদবীর ও লবিং এবং এক গ্রæপ অন্য গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগের কারনে সঠিক কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছেন না উপজেলা পর্যায়ের দায়িত্বশীল ইউএনও। এছাড়া বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আদেশে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের কারনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হচ্ছে। এতে বিভিন্ন এলাকায় রেশারেশির সৃষ্টি হচ্ছে। ঝগড়া ঝাটির সূত্রপাত ঘটছে এবং এই সুযোগে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীরা মাথা নাড়াচাড়া দিয়ে উঠছে। দিনে দিনে দ্ব›দ্ব সংঘাতের দিকে ধাপিত হচ্ছে। ফলে স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার প্রধানগণ স্কুলের নিয়মিত কাজ বাদ দিয়ে এডহক কমিটি নিয়ে ঘরোয়া পরিবেশে আবার কখনো সামাজিক পরিবেশে মিটিং সেটিং নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও লাঞ্চিতের শিকার হচ্ছেন প্রধানগণ। তাছাড়া হুমকি ধামকি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরে জমিন ঘরে দেখা যায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফাইল নিয়ে দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ। সেই সাথে বিভিন্ন দল ও গ্রæপের লোকজনও নিয়মিত আনাগোনা করছে এবং তদরীর, লবিং, সুপারিশসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় চাপের মুখে রাখছেন ইউএনও এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানগণকে। প্রায় প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠন নিয়মিত আন্তঃযুদ্ধে পরিণত হয়েছে। যার ফলে জয় পরাজয় ইস্যূ এবং কারো কারো ক্ষেত্রে ইগোতে লাগার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা হুমকির মুখে দাঁড়িয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক দল, গ্রæপ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রধান শিক্ষক বলেন, এলাকার স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গরা এডহক কমিটির বিষয় নিয়ে একে অপরের কূৎসা রটাচ্ছে। অন্য দিকে আমাকেও বিভিন্ন ভাবে হুমকি ধামকি দিচ্ছে। এই কমিটি নিয়ে মহাবিপদের মধ্যে আছি। বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাহিদা আক্তার বলেন, এডহক কমিটির বিষয়ে আমি অনেক তদবির ও সুপারিশ পাচ্ছি। তারপরেও আমি চেষ্টা করছি যাচাই বাছাই করে যোগ্যব্যক্তিদের নাম সুপারিশ করতে। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা জাহান বলেন, আমি দুই তিনদিন হলো যোগদান করিছি। এই বিষয়টি সর্ম্পকে আমার পুরোপুরি অবগত নেই।