বিগত কয়েক সাল আগেও মাটির হাড়ি পাতিল ও কলসী এবং অন্যান্য জিনিসপত্রের প্রচলন ছিল। কুমোরপাড়ায় দিন রাত কাদা মাটি থেকে নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরী করে হাট- বাজারে বিক্রি করতো। আবার ফেরিওয়ালারা ফেরি করেও মাটির তৈরী জিনিসপত্র বাড়ী বাড়ী ঘুরে বিক্রয় করতো। গ্রামের প্রত্যেকটি পরিবারে মাটির কলস, হাঁড়ি-পাতিল, থালা বাসনসহ হরেক রকমের মাটির তৈরী সামগ্রী দেখতে পাওয়া যেত। কিন্ত কালের বিবর্তনে কুমিল্লার বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মাটির বিভিন্ন জিনিসপত্র। এক সময় মাটির জিনিসপত্র তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করতো দুই উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মৃৎশিল্পরা। কিন্তু বর্তমানে সিলভার ও মেলামাইনের জিনিসপত্র মাটির জিনিসপত্রের স্থান দখল করে নেওয়ায় এবং পৃষ্ঠপোষকতা না থাকা ও নানা জটিলতার কারণে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকার জন্য বাপ-দাদার পেশাকে ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় সম্পৃক্ত হয়েছে বেশির ভাগ মৃৎশিল্পীরা। মাটির জিনিসপত্রের চাহিদা না থাকায় ক্রমান্বয়ে কমে গেছে কুমারের সংখ্যা। বর্তমান প্রজন্মের নিকট মাটির হাঁড়ি পাতিল এখন কৌতুহলে পরিনত হয়েছে কিংবা ঘরে সাজিয়ে রাখার জিনিসে পরিণত হয়েছে। অথচ তারা আজ জানেই না যে এক সময় প্রতিটি ঘরে ঘরে মাটির তৈজসপত্রে ভরপুর ছিল এবং মানুষ মাটির জিনিস বেশি ব্যবহার করতো। আজ তাদের কাছে এই কথাগুলো গল্পের মতোই মনে হয়। কারণ এই প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা তো জন্মের পর থেকেই দেখে আসছে মেলামাইন এবং সিরামিকের থালা- বাসন এবং সিলভারের কলসী ও হাঁড়ি-পাতিল। তবে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে তারা মাটির সানকিতে পান্তা ইলিশ খাওয়ার উৎসবে অবশ্য মাটির জিনিসপত্রের ব্যবহার দেখতে পায়। তাই বাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটির জিনিসপত্র গুলোকে আমাদের মাঝে টিকিয়ে রাখতে হলে কুমারদেরকে বিভিন্ন ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সচেতন মহলের দাবী আমাদের ঐতিহ্যবাহী মাটির সামগ্রী তৈরীর কারিগর কুমারদেরকে অর্থনৈতিক ভাবে সাহায্য সহযোগীতা করে এবং নতুন নতুন প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত করার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় আমাদের মৃৎশিল্প অচিরেই হারিয়ে যাবে। বুড়িচং এবং ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার হাঁট-বাজার গুলো ঘুরে দেখা গেছে মাটির জিনিসপত্রের তেমন কোন দোকান পাট নেই। বড় বড় বাজারগুলোতে দুই একটি দোকান থাকলেও ছোট ছোট বাজারগুলোতে তার অস্থিত্ব নেই। এছাড়া কুমারদের সংখ্যাও আগের তুলনায় তেমন একটা নেই। কুমোরপাড়া গুলোতে ঘুরেও দেখা গেছে দুই একটি ঘর তাদের আদি পেশা হিসেবে কোন মতে ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। তবে তাদেরও দ্রæত বিলপ্তি ঘটবে। যদি তাদের তালিকা করে প্রয়োজনীয় সহযোগীতা করা না হয়। দুই উপজেলার মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে স্থানীয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। এক সময় সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মাটির বিভিন্ন ধরনের হাড়ি-পাতিল বোঝাই ভাঁড় নিয়ে বিক্রেতারা ছুটে চলতেন দুই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে। কিন্তু বর্তমান বাজারে কাঁচ, অ্যালুমিনিয়াম, সিলভার, মেলামাইন ও প্লাস্টিকের কাছে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে মাটির বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র। বুড়িচং,উপজেলার রামপুর গ্রামের মৃৎশিল্পি পরিতোশ পাল জানান, এক সময় মাটির তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, কলসি, রঙিন ফুলদানি, ফুলের টপ, হাতি, ঘোড়াসহ নানা রঙের পুতুল ও বাচ্চাদের বিভিন্ন ধরনের খেলনা সামগ্রী উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজার ও গ্রামে গ্রামে বিক্রি করে সংসার চালাতাম। কিন্তু এখন প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের চাপে আগের মতো আর বেচাবিক্রি নেই। কোনো মতে পিঠা ভাজার খোলা, অল্প কিছু হাঁড়ি-পাতিল, মাটির ব্যাংক ও অর্ডার মোতাবেক কিছু ল্যাট্টিনের পাট তৈরি করে কোনো মতে চালাতে হচ্ছে সংসার। আবার অনেকেই বাপ-দাদার বংশীয় পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছে। আবার যারা বাপ- দাদার রেখে যাওয়া এ পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন, তাদের দিন যাচ্ছে অতিকষ্টে।